তুরস্ক রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন চায়

রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধান ও প্রত্যাবাসন নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে অধ্যাপক ইয়াসিন আক্তাই

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘ন্যাভিগেটিং রোহিঙ্গা ক্রাইসিস : ইজ রিপ্যাট্রিয়েশন আ ডিস্ট্যান্ট ড্রিম?’ শীর্ষক একটি বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা সফররত তুর্কির প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগানের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইয়াসিন আক্তাই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন : ‘বাংলাদেশ ও তুরস্কের বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্বের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে তুরস্ক সবসময় ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তুরস্ক চায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত হোক।’

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (বিআইআইটি) কনফারেন্স হলে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিআইআইটি ট্রাস্টের সহযোগিতায় এবং সেন্টার ফর সিভিলাইজেশনাল ডায়ালগের (সিসিডি) উদ্যোগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এবং এই সঙ্কটের টেকসই সমাধান নিয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

সিসিডির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ও বিআইআইটির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তুরস্কের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজচিন্তক ও দেশটির রাষ্ট্রপতির সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইয়াসিন আকতাই।

বৈঠকে দেশের ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক, গবেষক ও বিশ্লেষকরা অংশ নেন। বক্তব্য রাখেন- ড. বদিউল আলম মজুমদার, প্রতিষ্ঠাতা-সচিব, সুজন এবং সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর ও গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট, দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট; প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ফজলি ইলাহী, সাবেক ভিসি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস; ড. নকীব মুহাম্মদ নসরুল্লাহ, সাবেক ভিসি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়; ড. আবুল হাসান মু. সাদেক, প্রতিষ্ঠাতা ভিসি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; ইসাম শেহাদাত, সিনিয়র সম্পাদক, ডেইলি সাবাহ; ড. আইমান জেইদান, উপমহাপরিচালক, আল-কুদস ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন (কিউআইআই); কর্নেল (অব:) মোহাম্মদ আবদুল হক (পিএসসি), সাবেক চেয়ারম্যান, রাওয়া; মোস্তফা কামাল মজুমদার, সাবেক সম্পাদক, দৈনিক নিউ নেশন।

এ ছাড়া, আলোচনায় অংশ নেন তুরস্কে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ মান্নান, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাসুম, বিআইআইএসএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক কর্নেল আশরাফ আল দীন, বাদশাহ ফয়সাল ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) ড. এ কে এম মাকসুদুল হক, নারী উদ্যোক্তা তাজিমা হোসাইন মজুমদার, মুসলিম এইড-ইউকে বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মাহফুজুর রহমান চৌধুরী, মা’হাদুল ফিকরি ওয়াদদিরাসাতিল ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা শায়খ মুসা আল হাফিজ, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মীর লুৎফুল কবির সাদী, সোশ্যাল এইডের চেয়ারম্যান প্রসূন কান্তি বড়ুয়া এবং সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্টুডেন্ট কাউন্সিলর সিস্টার রেবা ভি. কস্তা প্রমুখ।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রফেসর ড. ইয়াসিন আকতাই বলেন: তুরস্ক চায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত হোক।

তিনি আরো বলেন, সীমিত সম্পদ ও উচ্চ জনসংখ্যার চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রায় ১৪ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বমঞ্চে অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই সঙ্কট সমাধানে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্বদেশে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সাথে শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণসহ মানবিক কার্যক্রম আরো বেগবান করার আহ্বান জানান তিনি।

অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজ তার বক্তব্যে বলেন, রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সঙ্কট। এটি এখন আর কেবল দু’টি দেশের সমস্যা নয়, বরং মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সংহতি, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, থিংকট্যাংক ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক মহলে দিন দিন উপেক্ষিত হচ্ছে। এই সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব কক্সবাজার ও ভাসানচরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর মারাত্মক সামাজিক-অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং নিরাপত্তা চাপ সৃষ্টি করছে। অনিয়মিত অভিবাসন, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধের মতো বিষয়গুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

বক্তারা ওআইসি, জাতিসঙ্ঘ, আসিয়ানসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। একই সাথে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি, নাগরিকত্ব প্রদান এবং রাখাইন অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন দৈনিক নয়া দিগন্তের নির্বাহী সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী, আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকির হোসেন, হিউম্যান রাইটস-এর ড. মাহদি হাসান, চিন্তক আহমেদ হোসেন মানিক এবং বিআইআইটির ডেপুটি ডিরেক্টর ড. সৈয়দ শহীদ আহমেদ প্রমুখ।