রণক্ষেত্র কিয়েভ ও মস্কো

হামলা-পাল্টা হামলা

Printed Edition
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত এক দমকল কর্মী  : ইন্টারনেট
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত এক দমকল কর্মী : ইন্টারনেট

এবিসি নিউজ ও আলজাজিরা

চলমান যুদ্ধ পঞ্চম বছরে পদার্পণ করার পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সঙ্ঘাত এবার এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এক দিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ লক্ষ্য করে যুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। অন্য দিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে ইউক্রেন। উভয় দেশের এই পাল্টাপাল্টি রক্তক্ষয়ী হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুল ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

কিয়েভে রাশিয়ার ইতিহাসের বৃহত্তম ব্যালিস্টিক হামলা

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী কিয়েভে রাতভর নজিরবিহীন ও শক্তিশালী বিমান হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত কিয়েভে চালানো এটিই সবচেয়ে বড় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। গতকাল রোববার ভোরের দিকে চলা কয়েক ঘণ্টার এই তাণ্ডবে এখন পর্যন্ত একজন নিহত এবং অন্তত ১৬ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ জানিয়েছে, হামলার ব্যাপ্তি ছিল শহরের ছয়টি জেলাজুড়ে।

রাষ্ট্রীয় জরুরি পরিষেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোববারের এই ভয়াবহ হামলায় পুরো কিয়েভজুড়ে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বহু আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক কার্যালয়, শিল্প প্রতিষ্ঠান, একটি ছাত্রাবাস এবং রাস্তায় থাকা অসংখ্য যানবাহন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দমকল কর্মীরা সভিয়াতোশিনস্কি জেলার একটি জ্বলন্ত বাড়ি থেকে চারজনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও শেভচেনকিভস্কি জেলার একটি তিনতলা ভবন থেকে পরবর্তীতে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

ইউক্রেনের জন্য এই সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়েছে ‘প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা মিসাইল’-এর তীব্র ঘাটতির কারণে। এরই মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ইউক্রেনীয় বাহিনী রণক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার সময়ই প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরোভকে বরখাস্ত করেন, যাকে অনেকেই জেলেনস্কির সবচেয়ে বড় ভুল বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর প্রতিবাদে দেশের রাজপথে বিক্ষোভ ও সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র হতাশা দেখা দিয়েছে।

রাশিয়াজুড়ে ইউক্রেনের ব্যাপক ড্রোন হামলা, নিহত ৯

কিয়েভে রুশ হামলার ঠিক আগেই রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেন ব্যাপক ড্রোন হামলা চালায়। বার্তা সংস্থা এপির বরাতে রুশ কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত চালানো এই হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত এবং ৮০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এই হামলায় মস্কোর কাছাকাছি একটি তেল ডিপো ও দেশটির বৃহৎ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের দু’টি বড় লজিস্টিক গুদাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তামবভ অঞ্চলের কতোভস্কের গুদামে রাতের শিফটে কর্মরত সাত শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হন। অন্য দিকে মস্কোর পূর্বে ইলেকট্রোস্তাল শহরের গুদামেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ জানান, নোগিনস্ক শহরের একটি তেল ডিপো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোয় কাছের একটি মাতৃসদন হাসপাতাল ও আবাসিক ভবন থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে হয়। সেখানে মোট ৬১ জন আহত হন, যাদের একজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া বেলগোরোদ অঞ্চলেও পৃথক এক ড্রোন হামলায় আরো একজন নিহত হয়েছেন।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ১৯টি অঞ্চল, ক্রিমিয়া, আজভ সাগর ও কৃষ্ণসাগরের আকাশে মোট ৩৭৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছেন, হামলায় লক্ষ্যবস্তু করা রুশ স্থাপনাগুলো মূলত ড্রোনের নেভিগেশন সরঞ্জাম তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যন্ত্রাংশ সরবরাহে ব্যবহৃত হতো।

পাল্টা আঘাত ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ

রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে কয়েকটি রুশ তেলবাহী জাহাজ এবং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন লুহানস্ক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলসেতুতেও হামলা চালিয়েছে। কিয়েভের মূল লক্ষ্য হলো রাশিয়া অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে জ্বালানি ও সামরিক রসদ সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে দেয়া। এই চরম সঙ্কটের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইউক্রেনকে দেশীয়ভাবে প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স দিতে ওয়াশিংটন প্রস্তুত, তবে এর সময়সীমা এখনো স্পষ্ট নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করাই এখন আমাদের প্রধান এবং স্থায়ী অগ্রাধিকার। প্রতিদিন আমাদের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।’