নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- রহমতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দাফতরিক কার্যক্রম চলে সপ্তাহে ১ দিন
- নবাবগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ ও দালাল ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না
দেশের দুই প্রান্তে ভূমি সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় সপ্তাহে মাত্র একদিন চলছে দাফতরিক কার্যক্রম। ফলে একদিকে যেমন সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্য দিকে নাজেহাল হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। অপর দিকে, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিস দালালের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ঘুষ ও দালাল ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও দালালের চাহিদা পূরণ না করলে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে প্রকৃত জমির মালিকদের। জনবল সঙ্কট ও দুর্নীতির এই দ্বিমুখী সঙ্কটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা না থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে কার্যক্রম। ফলে জমির দলিল করতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সারা দিন অপেক্ষা করেও কাক্সিক্ষত সেবা মিলছে না। এতে জমিজমা কেনাবেচা স্থবির হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই অফিসের আওতায় ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। বর্তমান খণ্ডকালীন সাব-রেজিস্ট্রার যোবায়ের হোসেন একাধারে হিজলা, বাকেরগঞ্জ ও বাবুগঞ্জ; এই তিন উপজেলার দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি সপ্তাহে কেবল বুধবার রহমতপুরে অফিস করেন। ফলে সপ্তাহের এক দিনে কয়েক গুণ ভিড় বেড়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ দীর্ঘ অপেক্ষায় থেকে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। সেবাগ্রহীতা শফিকুল ইসলাম বলেন, সকালে দলিল করতে এসে রাত হয়ে যায়। সপ্তাহে একদিন অফিস হওয়ায় চাপের কারণে কাক্সিক্ষত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না।
এই অচলাবস্থার কারণে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি এই অফিসকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করা সহস্রাধিক দলিল লেখক, ভেন্ডার ও তাদের সহযোগীদের পরিবার এখন কর্মহীন হওয়ার উপক্রম। রহমতপুর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি জুয়েল তালুকদার জানান, আগে সপ্তাহে তিন দিন অফিস চললে ২০০ থেকে ৩০০টি দলিল সম্পাদন হতো, যা এখন মাত্র ৭০টিতে নেমে এসেছে। এতে তারা পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ভূমি অফিস সংশ্লিষ্ট ও এলাকাবাসী জনস্বার্থে এবং রাজস্ব আয় ঠিক রাখতে অবিলম্বে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন নিয়মিত দাফতরিক কার্যক্রম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মোহছেন মিয়া জানান, কর্মকর্তাদের বদলি ও অবসরে যাওয়ার ফলে পদটি শূন্য হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলে দ্রুতই স্থায়ী সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে।
নবাবগঞ্জ (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোতে দালাল ও দুর্নীতির দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ ভূমি মালিকরা। প্রতিটি অফিসে সরকারি ফি তালিকা টাঙানো থাকলেও তা কেবল লোকদেখানো। বাস্তবে দালালদের মাধ্যমে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে শতগুণ বেশি টাকা খরচ না করলে কোনো কাজই সম্পন্ন হচ্ছে না। এমনকি বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও ঘুষের টাকা দিতে না পারলে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে প্রকৃত মালিকদের।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দেখা যায়, অফিসের নিয়মিত কর্মচারীদের চেয়েও বাইরের লোকের প্রভাব বেশি। অনেক অফিসে বহিরাগতরা কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি ও গোপন নথিপত্র নাড়াচাড়ার কাজও করছেন। শরিফুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, ৪ শতক জমি খারিজের জন্য জাহিদুল ইসলাম নামের এক দালালকে তাকে ২৮ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এভাবে সাধারণ মানুষ দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যদিও দালাল জাহিদুল ইসলাম অতিরিক্ত টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কেবল অনলাইনে আবেদনের ক্ষেত্রে সহায়তা করেন।
বিনোদনগর ও ভাদুরিয়ার মতো ভূমি অফিসগুলোতে বহিরাগতদের সহায়তা নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। বিনোদনগর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মরিয়ম আক্তার বলেন, কাজের চাপের কারণে মাঝে মাঝে বাইরের লোকের সাহায্য নিতে হয়। ভাদুরিয়ার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মুখেশ চন্দ্র রায় জানান, খারিজের সরকারি ফি মাত্র ১১৭০ টাকা। এর বাইরে কোনো লেনদেন হওয়ার কথা নয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, টাকা ছাড়া ফাইল নড়ছে না কোথাও।
ভূমি মালিকদের অভিযোগ, দালালদের বিরুদ্ধে কথা বললে জমির দাগ ও খতিয়ানে ঝামেলা পাকিয়ে দেয়া হয়। ফলে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। দালালদের চাহিদামতো টাকা দিলে অন্যের জমিও জালিয়াতির মাধ্যমে রেকর্ডভুক্ত করার মতো ভয়ঙ্কর অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাজিদ উল মাহমুদ বলেন, দালাল বা ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে এখনো লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।



