আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
সিলেটে গত দুই সপ্তাহে লোডশেডিং বেড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিং নগরবাসীর জীবনে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিদ্যুৎ সঙ্কটে স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার বিপরীতে অর্ধেকের কাছাকাছি বিদ্যুৎ কম পাওয়ায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয় বাধ্য হয়েই ব্যাপকভাবে লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী। স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের মাত্রা বাড়ছে।
জানা যায়, সিলেট বিভাগের কুমারগাঁও, বিবিয়ানা, শাহজিবাজার ও ফেঞ্চুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। অথচ এত বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়া সত্ত্বেও তার কোনো প্রত্যক্ষ সুফল পাচ্ছেন না সিলেটের প্রায় এক কোটি গ্রাহক। তবে পিডিবি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা কেবল জাতীয় গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বরাদ্দ বণ্টন করে; বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরাসরি দায়িত্ব তাদের নয়।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ জুলাই সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিনগুলোতেও তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ওঠানামা করেছে। সম্প্রতি তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকার কারণে প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। গরমের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথেই বিদ্যুতের চাহিদাও লাফিয়ে বাড়ে, যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার সকাল ১০টায় সিলেটে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬৮ মেগাওয়াট, অথচ সরবরাহ মিলেছে মাত্র ১৩৮ মেগাওয়াট। বেলা বাড়ার সাথে সাথে এই ঘাটতি ৬০ থেকে ১০০ মেগাওয়াটে গিয়ে ঠেকে। ফলে বিকেল পর্যন্ত নগরজুড়ে এক ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের চিত্র দেখা যায়। নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১৫ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে এবং গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়। এতে প্রবীণ, শিশু ও অসুস্থ রোগীরা সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের তীব্র সঙ্কটই মূলত এই লোডশেডিংয়ের মূল কারণ। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ায় সেটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে গত ১০-১২ দিনে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে, যা দৈনিক প্রায় ৪৯ কোটি ঘনফুট কম। দেশে যেখানে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট, সেখানে বর্তমানে মিলছে মাত্র ২১৫ কোটি ঘনফুট। ফলে চাহিদার বিপরীতে দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট।
গ্যাসের জোগান কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে গেছে। কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হলেও চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। গত ২৫ জুলাই রাতে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৯৬২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। পেট্রোবাংলার হিসেব মতে, পাঁচ দিনের ব্যবধানে এলএনজি সরবরাহ ৯৯ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ৫০ কোটি ঘনফুটে এসে ঠেকেছে।
পিডিবি সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে আমরা যতটুকু সরবরাহ পাই, কেবল ততটুকুই বিতরণ করতে পারি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি সামলানোর ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ মেলায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং বাড়াতে হচ্ছে। এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, করিগরি জটিলতায় পড়া টার্মিনাল থেকে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে।



