নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন। সন্ত্রাস এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমরা আপস করতে চাই না। তাই দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা যেন করা না হয়। গতকাল সোমবার সকালে তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শাপলা সম্মেলন কেন্দ্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডিআইজি ও পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ওপর কার্যক্রমের ওপর একটি ভিডিও তথ্য চিত্র উপস্থাপন করা হয়। এর আগে গত রোববার সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বার্ষিক প্যারেডের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত এবং জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় আমরা দেখেছি, আপনাদেরকে একটা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। পলিটিক্যাল পরিচয় বা পলিটিক্যাল প্রভাব দিয়ে আপনাদেরকে ফেইস করতে হয়। আমি আপনাদেরকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই, দুর্নীতি সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, যে বা যারা অপরাধে লিপ্ত হবে তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করবেন। আইনের প্রয়োগ সবার জন্যই সমান। কোনো ব্যক্তি বা দল নয় আপনারা আইনের রক্ষক। আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সাথে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত এবং মানবিক। অন্য সব কার্যক্রমের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও আপনাদের পুলিশি কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়। এটিও আপনাদের দায়িত্বের একটি অংশ। বর্তমান সরকার অবশ্যই জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত রাখতে চায়। তবে কেউ যেন সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কিংবা কোনো রকমের নাশকতামূলক কার্যক্রমে লিপ্ত হতে না পারে এটিও আমাদের সবাইকে লক্ষ রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, টেকনোলজির কারণে তার ধরন বেড়েছে। পাশাপাশি যেহেতু অপরাধের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। ফলে পুলিশ প্রশাসনের কার্যক্রমের পরিধিও আরো ব্যাপক এবং বিস্তৃত হয়েছে। এ কারণে বিশেষ করে আমাদের প্রতিটি পুলিশ কর্মকর্তাকে বহুমুখী দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। এটি এখন সময়ের দাবি। পুলিশ প্রশাসনে নির্দিষ্ট কিছু পদ নয়, প্রতিটি ‘পদ’ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং, প্রশাসনের সব পদেই কাজ করার পেশাদারি মানসিকতা থাকা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশেই একটি সরকারের সাফল্যের জন্য দক্ষ, সাহসী, সৎ এবং নিরপেক্ষ পুলিশ প্রশাসনের বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিপদে পড়লে মানুষ কিন্তু প্রথমে পুলিশের কাছেই যায়। আমি বিশ্বাস করি, পুলিশ আন্তরিকভাবে চাইলে আইনি এবং কৌশলী ভূমিকা নিয়ে পুলিশের পক্ষে অনেক ঘটনা শুরুতেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব। পুলিশের কার্যক্রমের ওপর পুলিশের আস্থা এবং নির্ভরতা সৃষ্টি হলে ৫ আগস্টের পরে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, মব ভায়োলেন্স- আমি তো মনে করি সেসব সহজেই সমাজ থেকে দূরীভূত হয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ এর গণ-অভ্যুথানের পথ ধরে বর্তমানে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক যেই গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এই সরকার এমন একটি পুলিশ প্রশাসন চায়, যেই পুলিশ হবে জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থাভাজন।
‘সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর।’
রুপপুর পরমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় প্রত্যেকটি সেক্টর খুব ভঙ্গুর অবস্থা পেয়েছি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে যখন সরকার যাত্রা শুরু করে সে রকম একটা অবস্থার মধ্যে আমরা এই দেশটিকে পেয়েছি। দেশে কিভাবে দুর্নীতি হয়েছে তার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে রূপপুর সম্পর্কে দেখা গেছে, একটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিন্তা করা যায়, কোনো বালিশের দাম পৃথিবীতে ৮০ হাজার টাকা হতে পারে। ড্রেসিং টেবিলের দাম ধরা হয়েছে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই রূপপুর প্রকল্পটির সিমিলার প্রকল্প আমাদের পাশের একটি দেশ করেছে। তাদের লেগেছে সম্ভবত ১৪ হাজার কোটি টাকার মতো। বাংলাদেশের রূপপুর যে প্রকল্পটি করা হয়েছে এটির খরচ আল্টিমেটলি খুব সম্ভবত দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। একটি টানেল তৈরি করা হয়েছে টানেলটির নাম কর্ণফুলী টানেল। সেখানে কয়েক শত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অডিটর জেনারেলের ইনভেস্টিগেশনে বেরিয়ে এসেছে যে কর্ণফুলী টানেল বের হওয়া বা বা ঢোকার আগে দুই পাশে গাছ লাগানোর কথা। উনি কোন গাছ পাননি। এই গাছের জন্য ৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে চলে গিয়েছে।
অতীত সরকারের দুর্নীতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পিরোজপুর ডিস্ট্রিকটে তিনটি আসন। তিনটি আসনের তিনজন সংসদ সদস্য সংসদ চলাকালীন সময় আমার কাছে এসেছিলেন কথা বলবেন। আমি খুব সংক্ষেপে শোনার পরে আমার মনে পড়ল যে সাত আট মাস আগে মনে হয় ঘটনাটি পত্রিকায় পড়েছিলাম, কিছুটা ধারণা ছিল আমার। রাস্তাঘাট মানুষের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে সেজন্য উনারা এসেছিলেন যে কি করে কাজ শুরু করা যায়। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম যে সেখানে শুধু এলজিআরডি একটা মিনিস্ট্রি থেকে ৩৫ হাজার কোটি নাই হয়ে গিয়েছে, শুধু কাগজ দেখিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেছে কোনো কাজ হয়নি, ৩৫ হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেছে। আমি জানতে পারলাম আরো কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ে একটি জেলাতে ৬ হাজার কোটি টাকা নেই। এ রকম আরো অনেক ঘটনা আছে, ঘটনাগুলো ঘটেছে।
পুলিশের আবাসন, ট্রান্সপোর্টেশনের সমস্যার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এগুলোর জন্য অর্থ প্রয়োজন। আমরা যদি এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারি আপনারা মানুষকে বেটার সার্ভিস দিতে পারবেন। কিন্তু এই লিমিটেশনের জন্য হয়তো আশানুরূপ সার্ভিস দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্রিজের খরচ হয়েছে ৫৪ বা ৫৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আল্টিমেটলি ২০ কোটি মানুষের উপরে এই ঋণের বোঝা এসে পড়ছে। আজকে যদি এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো না হতো তাহলে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা আরো বেটার কিছু করতে পারতাম। বাট আমাদেরকে যেমন করতে হবে আমরা এভয়েডও করতে পারব না, এটা বাস্তবতা।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পুলিশ বাহিনীতে দুর্নীতির কোনো স্থান হবে না। চেইন অব কমান্ড এবং ডিসিপ্লিন রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না। মন্ত্রী বলেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাথে তালমিলিয়ে একটি সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন সমস্যা ও তাদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (সিআইডি) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান ও আহম্মদ মুঈদ, ঢাকার সুপার শামীমা পারভীন এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দের সাক্ষাৎ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে তারা সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎকালে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ নেতারা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরী পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং দেশে রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
এ সময় শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উচ্চশিক্ষার রূপান্তরে ইউজিসির কর্মশালা আজ : উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও টেকসই করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ‘বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা রূপান্তর : টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক এক জাতীয় কর্মশালার আয়োজন করেছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে দিনব্যাপী এই কর্মশালার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি তার প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।
গতকাল বিকেল ৩টায় ইউজিসির সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মশালার বিস্তারিত তুলে ধরেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিকমানের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এই কর্মশালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া এটি উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষা উন্নয়নে বাস্তবায়নযোগ্য নীতিগত পথনকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা, বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসিসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত থাকবেন।



