দখল ভরাট ও দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে আত্রাই

ডিএস নকশায় ৩০০ ফুট প্রশস্ত নদী আরএস রেকর্ডে নেমেছে ৪৫ ফুটে

Printed Edition
পাবনার আত্রাই নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন : নয়া দিগন্ত
পাবনার আত্রাই নদী ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল ভবন : নয়া দিগন্ত

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

বর্ষাকালেও পানির প্রবাহ নেই পাবনার ঐতিহ্যবাহী আত্রাই নদীতে। দখল, মাটি ভরাট, দূষণ ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে নদীটির বড় একটি অংশ এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। কোথাও কোথাও নদীর চিহ্ন পর্যন্তও খুঁজে পাওয়া যায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং ভূমি রেকর্ডে অনিয়মের সুযোগে প্রভাবশালীরা নদীর জায়গা দখল করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নন্দনপুর ইউনিয়নে ইছামতি নদী থেকে আত্রাই নদীর উৎপত্তি। সাঁথিয়া, বেড়া ও সুজানগর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নদীটি মাসুমদিয়া এলাকায় বাদাই নদীর সাথে মিলিত হয়ে যমুনায় পড়েছে। জেলার অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র কাশিনাথপুর বাজারের বড় একটি অংশ নদীতীর ঘেঁষে গড়ে ওঠায় সময়ের সাথে সাথে নদীর জমির ওপর দখলের চাপও বেড়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, কাশিনাথপুর ট্রাফিক মোড় থেকে হাটের পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় নদীর জায়গাজুড়ে সারি সারি পাকা ও আধাপাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও মার্কেট, কোথাও বহুতল ভবন, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আবার কোথাও দোকানঘর গড়ে উঠেছে। হাটসংলগ্ন অংশে নদীর মাঝ বরাবর একটি সেতু নির্মাণ করে দুই পাশে সড়ক তৈরি করা হয়েছে। সেই সড়কের দুই পাশে চলছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এই স্থানে এসে বোঝার উপায় থাকে না যে একসময় এটি ছিল নদীরই একটি অংশ।

নদীর অবশিষ্ট অংশের কোথাও জমে আছে আবর্জনা, কোথাও বদ্ধ জলাশয়, আবার কোথাও চাষাবাদ করা হচ্ছে। কাশিনাথপুরের পশ্চিমাংশ থেকে নন্দনপুর পর্যন্ত নদীর বুক চিরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেচ ক্যানেল নির্মাণও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে প্রভাব ফেলেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, একসময় আত্রাই ছিল খরস্রোতা নদী। লঞ্চ ও পালতোলা নৌকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হতো। ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। উন্নত সড়ক যোগাযোগের পর নদীর ব্যবহার কমে গেলে ধীরে ধীরে শুরু হয় দখল-বাণিজ্য। বর্তমানে নদী তার নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ প্রায় হারিয়ে ফেলেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রজব আলী বলেন, নদী রক্ষায় বিভিন্ন দফতরে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। কালাম ও রতন মিয়াসহ কয়েকজন বলেন, জলাধার সংরক্ষণে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না থাকায় দখলদাররা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, ডিএস নকশায় আত্রাই নদীর প্রশস্ততা ছিল ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট। কিন্তু আরএস নকশায় দেখা যায় তা কমে গিয়ে মাত্র ৪৫ ফুটে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সাঁথিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ও এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

কাশিনাথপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) মো: মাইনুল ইসলাম বলেন, স্থাপনা নির্মাণের কারণে নদী সঙ্কুচিত হয়েছে। বিশেষ করে সুজানগর উপজেলার অংশে দখল বেশি হয়েছে। তিনি জানান, আরএস নকশায় নদীর প্রস্থতা কম থাকায় একাধিকবার জরিপকাজ শুরু হলেও তা শেষ করা যায়নি। তার ভাষ্য, কাশিনাথপুর অংশে এখনো সরকারি খতিয়ানে নদীর কিছু জমি রয়েছে।

সাঁথিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: আসিফ রায়হান বলেন, নদী দখলের বিষয়টি সরেজমিন দেখে তিনি মর্মাহত হয়েছেন। নদীটি দখলমুক্ত করতে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বেড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: জাহিদুল ইসলাম বলেন, আত্রাই নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি সত্য। নদী পুনরুদ্ধারে দ্বিতীয় পর্যায়ের খনন প্রকল্পে কাশিনাথপুর থেকে মাসুমদিয়া পর্যন্ত প্রায় ২২ কিলোমিটার নদী খননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সিএস ও ডিএস নকশা অনুযায়ী খনন করা হলে নদীর অবৈধ দখল স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছেদ হবে বলে তিনি জানান।