আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির অনুপাতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৈচিত্র্যময়। সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের দেশগুলোর গড় প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির প্রায় ২.২ শতাংশ হলেও, দেশভেদে এর পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দেশ হলো বাংলাদেশ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোচনায় প্রতিরক্ষা ব্যয় সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই অঞ্চলে সামরিক ব্যয় কেবল নিরাপত্তা চাহিদার প্রতিফলন নয়; বরং তা রাষ্ট্রের কৌশলগত অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নতুন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রবণতা বজায় রেখেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান : নি¤œ সামরিক ব্যয়ের মডেল
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ব্যয়ের মানচিত্রে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থানে রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। একই সময়ে দেশের সম্ভাব্য জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি বাজেটের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির প্রায় ০.৬২ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশগুলোর মধ্যে সর্বনি¤œ। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশ এখনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সামাজিক খাতের বিনিয়োগকে সামরিক ব্যয়ের তুলনায় অধিক অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।
তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট ভিন্ন পদ্ধতিতে সামরিক ব্যয় হিসাব করে থাকে। তাদের হিসাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি বরাদ্দের পাশাপাশি সামরিক পেনশন, জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষাকার্যক্রম এবং অন্যান্য নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের সামরিক ব্যয় সাধারণত জিডিপির ১.১ থেকে ১.৩ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করে।
পাকিস্তান ও ভারতের সামরিক আধিপত্য
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয়ে সবচেয়ে বড় অংশীদার দু’টি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র-পাকিস্তান এবং ভারত। পাকিস্তান বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২.৭ থেকে ২.৯ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সঙ্কট, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশটির সামরিক ব্যয় উচ্চপর্যায়ে থাকার পেছনে ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্য দিকে, ভারত জিডিপির প্রায় ২.৩ থেকে ২.৪ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাজেট বজায় রেখেছে। চীন ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে দ্বিমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশের লক্ষ্য ভারতের সামরিক ব্যয়কে ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ে রেখেছে।
অর্থনৈতিক সঙ্কটেও শ্রীলঙ্কার উচ্চ ব্যয়
শ্রীলঙ্কা তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠলেও দেশটি এখনো জিডিপির প্রায় ১.৮ থেকে ১.৯ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সামরিক অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয়কে তুলনামূলকভাবে উচ্চপর্যায়ে ধরে রেখেছে।
অন্য দিকে, নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটানের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো তুলনামূলকভাবে সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট অনুসরণ করছে। ভুটানের ক্ষেত্রে স্থায়ী সেনাবাহিনী না থাকায় তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ০.৫ শতাংশেরও নিচে অবস্থান করছে।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশের কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান নিরাপত্তা পরিবেশে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল অনুসরণ করছে। এক দিকে, ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে; অন্য দিকে, সামরিক ব্যয়কে অর্থনৈতিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গত এক দশকে বাংলাদেশ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রতিরক্ষা ব্যয় যেখানে জিডিপির প্রায় ২.২ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের প্রকৃত সামরিক ব্যয় আন্তর্জাতিক হিসাবেও এর অনেক নিচে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের এই সংযত প্রতিরক্ষা ব্যয়নীতি এক দিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে, অন্য দিকে আঞ্চলিক সামরিক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি পরিহারে বাধ্য হতে হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী তবে ভঙ্গুর নিরাপত্তা কৌশলের উদাহরণ হিসেবে অবস্থান বজায় রেখেছে। এই অবস্থা মূলত তৈরি হয়েছে কর্তত্ববাদী ১৭ বছর শাসনামলে।



