মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমরা সরকার গঠন করার পর দেশের সব অবস্থাকে ধ্বংসপ্রাপ্ত পেয়েছি। একদিনে সব সমস্যার সমাধান হবে না। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে আমাদের দেশ গড়ে তুলতে হচ্ছে। রাষ্ট্র মেরামত ও দেশ পুনর্গঠনের কাজ আমরা শুরু করেছি। এ জন্য সবাইকে হাতে হাত রেখে কাজ করতে হবে। সবাইকে আমাদের সহযোগিতা করতে হবে।’
গতকাল রোববার সকালে দিনব্যাপী কিশোরগঞ্জ সফরের শুরুতে জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায় পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উদ্বোধন উপলক্ষে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত দিনে দেশের মানুষের অর্থসম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। সেই পাচারকারীদের দেশের মানুষ বিতাড়িত করেছে। এখন সময় সবাইকে একসাথে কাজ করার। কারণ দেশের মালিক বাংলাদেশের জনগণ। দেশকে গড়ে তুলতে হলে জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যে ছাত্র-জনতা ২৪-এর ৫ আগস্ট রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছিল, সেই জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। যারা দেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে কথা বলবে, মানুষের জন্য নেয়া বাস্তব পদক্ষেপগুলোতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচার এ দেশের অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ প্রত্যেকটি ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছে। আমরা সরকার গঠন করার পর দেশের সব অবস্থাকে ধ্বংসপ্রাপ্ত পেয়েছি। সেজন্য আমাদের ধ্বংস থেকে দেশকে গড়ে তুলতে হচ্ছে।’
কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এখানকার ব্রিজ ও রাস্তার কথা সংসদ সদস্যরা বলেছেন। দেশের উন্নয়ন হয়ে থাকলে এসব কাজ এত বছরেও কেন হয়নি- সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য- আগে যারা দেশের শাসনভার দখল করে রেখেছিল, তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিল না। তারা জোর করে ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল বলেই জনগণের জন্য কোনো কাজ করেনি।
বিদ্যুৎ সঙ্কট নিয়েও কথা
বিদ্যুতের সমস্যার জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু ঢাকা নয়, জেলা-উপজেলাসহ দেশের বহু মানুষ এখন বিদ্যুতের কষ্ট ভোগ করছেন। স্বৈরাচার সরকারের অপরিকল্পিত পরিকল্পনা ও বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা যেহেতু বিএনপিকে নির্বাচিত করেছেন, বিএনপি দেশের মানুষের দল। বিএনপি এ দেশের স্বার্থেই কাজ করবে। বিএনপি এ দেশের মানুষের স্বার্থে কাজ করবে।’
তিনি জানান, আগামী ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। ওই অধিবেশনে দেশের মানুষের সামনে আগামী ১০ বছরে কিভাবে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা হবে, সেই পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে তুলে ধরা হবে।
বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলায় সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো সঙ্কট মোকাবেলায় ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে হবে। তবে এই সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রাজপথে বিশৃঙ্খলা হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। তাদের ব্যবসাবাণিজ্য, চাকরি ও জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এতে বিশৃঙ্খলাকারীরা উপকৃত হয়।
কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনই তার সরকারের লক্ষ্য। গ্রাম ও উপজেলায় থাকা মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়- এমন পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করতে চান তারা।
এ জন্য খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ অভিযান, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্কুলের শিশুদের পোশাক ও নতুন বই দেয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কাজ যারা বাধাগ্রস্ত করবে, রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং মিথ্যা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করবে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি যতবার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, ততবারই কিছু রাজনৈতিক দল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। তার সরকার জনগণের স্বার্থে কাজ করতে চায়।
‘এখন সময় দেশকে এগিয়ে নেয়ার’
তারেক রহমান বলেন, ‘এখন সময় হচ্ছে কাজ করার। এখন সময় হচ্ছে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।’ দেশকে এগিয়ে নিতে না পারলে দেশের মানুষকে কষ্ট করে থাকতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিগত দিনে দেশের অর্থসম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এসব করেছে, তাদের দেশের মানুষ বিতাড়িত করেছে। এখন রাষ্ট্র মেরামত ও দেশ পুনর্গঠনের কাজ করতে হবে। দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখতে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ এখন কর্মসংস্থান, সন্তানদের জন্য শিক্ষা এবং পরিবারের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা চায়। এসব নিশ্চিত করতে ধৈর্যের সাথে কাজ করতে হবে এবং সরকারকে সময় দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দেশে অনেক বিভ্রান্তকারী ও রটনাকারী আছে। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের দিকেও নজর রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি ৭১-এ তাদের ভূমিকা কী ছিল। আমরা দেখেছি ৮৬ সালে তাদের ভূমিকা কী ছিল। আমরা দেখেছি ৯৬ সালে তাদের ভূমিকা কী ছিল। আমরা দেখেছি বিগত ১৭ বছরের জনগণের যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনে তাদের আমরা রাজপথে দেখিনি।’
জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাকুন্দিয়ার মির্জাপুর চেয়ারম্যান বাড়ি ঘাট এলাকায়। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত ও বিতরণের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা এলাকায় কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। এরপর আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউশন মাঠে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬-এর উদ্বোধন ও জাতীয় মৎস্য পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো: জালাল উদ্দীন বক্তব্য দেন। এ সময় কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানসহ পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ফ্যামিলি কার্ড ও সম্মানী প্রদান
বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের পুরনো স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, মেধাবী শিক্ষার্থী, অসুস্থ, দুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুদান এবং মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ৪৩২ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম, পাঁচটি মন্দিরের ১০ জন পুরোহিত এবং একটি গির্জার দু’জন যাজকসহ মোট ৪৪৪ জনকে সম্মানী প্রদানের মাধ্যমে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলম, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে হাওরে উড়াল সেতু বাস্তবায়নের দাবি জানান।
পরে প্রধানমন্ত্রী ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে যান। সেখানে তিনি শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করেন এবং জেলা ছাত্রদলের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
ব্রহ্মপুত্রে সেতু নির্মাণের ঘোষণা
পাকুন্দিয়া সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো: জালাল উদ্দিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাকুন্দিয়া উপজেলার দীর্ঘদিনের কাক্সিক্ষত পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের মুনিয়ারীকান্দা-দত্তেরবাজার সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাকুন্দিয়া উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”
এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা থেকে সড়কপথে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।
পোনা অবমুক্তকরণ কার্যক্রম শেষে আয়োজিত আলোচনা সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো: জালাল উদ্দিন। তিনি তার বক্তব্যে এলাকার বিভিন্ন সমস্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এর পরেই প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হাজারো মানুষের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নিচে নেমে গেলেও তিনি পুনরায় মঞ্চে ওঠেন এবং মাইক হাতে নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এ সময় উপস্থিত হাজারো মানুষ আনন্দে ও উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো: ফজলুর রহমান, ময়মনসিংহ-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাছরিন, পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রূপম দাসসহ বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।



