উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতির চাপ ও দুর্বল বিনিয়োগের বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি

বাজেটোত্তর সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান সাম্প্রতিকতম (জুলাই ২০২৬) অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য অনুসারে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের নেতিবাচক প্রভাবের বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান সাম্প্রতিকতম (জুলাই ২০২৬) অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য অনুসারে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণ পার করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং দুর্বল অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের নেতিবাচক প্রভাবের বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আপেক্ষিক স্থিতিশীলতা অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।

বাজেটোত্তর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা শ্লথ গতি রয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুসারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৪.১৪%-এ উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৫ অর্থবছরের ৩.৪৯%-এর চেয়ে বেশি। তবে এটি করোনা মহামারী-পূর্ববর্তী ৭% প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশ কম।

অন্য দিকে মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালের জুনে ৯.১৬%-এ অবস্থান করছে (যা ২০২৫ সালের জুনের ৮.৪৮%-এর চেয়ে বেশি)। এর আগে মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৯.৪২%-এ উঠেছিল। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি অবশ্য একই সময়ে ৮.৬৮%-এ নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের ১০.১৩%-এর চেয়ে কম হলেও বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরাতে পারেনি।

ব্যাংকিং খাত : খেলাপি ঋণের রেকর্ড ও তীব্র তারল্য সঙ্কট

বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক অবস্থা ও তারল্য পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বকেয়া ঋণের ৩২.২৬%-এ পৌঁছেছে, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি ‘রেড অ্যালার্ট’। বিভিন্ন আইনি স্থগিতাদেশ, অবলোপন ও পুনঃতফসিলীকরণের পরও খেলাপি ঋণের এই হার চরম কাঠামোগত দুর্বলতা ও মূলধন ঘাটতিকে নির্দেশ করে। এ সময়ে নেট খেলাপি ঋণের পরিমাণও বকেয়া ঋণের ১৫ শতাংশের ওপরে।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং তারল্য সঙ্কটের কারণে ওভারনাইট কল মানি রেট ১০.০৫%-এ উন্নীত হয়েছে। তবে টাকার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। ১৬ জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী আন্তঃব্যাংক এক্সচেঞ্জ রেট দাঁড়িয়েছে প্রতি ডলার ১২৩.৩৭ টাকা।

অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের তুলনায় সরকার ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মে ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী (মে ’২৫ থেকে মে ’২৬ পর্যন্ত), সরকারের নিট ঋণ প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ২৪.৬১%। এর বিপরীতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪.৯৮%। বেসরকারি ঋণের এই মন্দা শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ অর্থবছরে শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ বিতরণ ২১.০৮% বৃদ্ধি পেয়ে ৯৭,১৩৮ কোটি টাকায় পৌঁছলেও, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে ধীরগতি দেখা গেছে। ২০২৫ অর্থবছরে সামগ্রিক এসএমই ঋণ বিতরণ ৬.১৪% হ্রাস পেয়েছে। এ সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল ঋণাত্মক (-৬,০৬৩.৩৩ কোটি টাকা)। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষ নতুন সঞ্চয়পত্র কেনার চেয়ে আগের জমানো টাকা তুলে নিচ্ছে বেশি, যা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ।

বহিস্থ খাত : রেমিট্যান্স ও রফতানির হাত ধরে স্থিতিশীলতা

বহিঃবাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে থেকে সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় পতনের হাত থেকে রক্ষা করছে।

২০২৫ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ২৬.৮৩% বৃদ্ধি পেয়ে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা রিজার্ভের মূল চালিকাশক্তি। একই সাথে রফতানি আয় ৭.৭২% বৃদ্ধি পেয়ে ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলার (এফওবি) হয়েছে। এই সময়ে সামগ্রিক আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ১.৭৫% (এফওবি)। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি ২৫.৪২% হ্রাস পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের জন্য নেতিবাচক। অবশ্য পেট্রোলিয়াম (+৬.৪২%) এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল র মেটেরিয়ালস (+৮.৩৭%) আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৬ অর্থবছরে এসে পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটে। এসময়ে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ১৭.৩৪ শতাংশে নেমে আসে। আর এই অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রফতানি আয় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয় ২ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি হয় সোয়া ৬ শতাংশ।

১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী ২৫.০০ বিলিয়ন ডলার)। এটি ৩০ জুনের (৩১.৯৭ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে কিছুটা কমলেও একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে।

তারল্য সঙ্কট ও ব্যাংকিং খাতের রক্তক্ষরণ

একটি ব্যাংকের মূল চালিকাশক্তি হলো তার ঘূর্ণায়মান তহবিল, অর্থাৎ ব্যাংক ঋণ দেবে, সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ ফেরত আসবে এবং তা দিয়ে আবার নতুন ঋণ দেয়া হবে। কিন্তু ৩২ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় এই চক্রটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সহজ কথায়, আমানতকারীদের রাখা প্রতি ৩ টাকার ১ টাকাই বাজারে আটকে গেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধাপে ধাপে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থ মুনাফা থেকে আলাদা করে রাখতে হওয়ায় ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা কমে যাচ্ছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়ছে। টানা লোকসানের কারণে অনেক ব্যাংক আন্তর্জাতিক ব্যাসেল-৩ মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে তাদের ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

অন্য দিকে যেসব ব্যাংকের ঋণ দেয়ার সক্ষমতা এখনো রয়েছে, তারাও ঝুঁকি এড়াতে নতুন ঋণ অনুমোদনে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে যোগ্য উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও কার্যকর মূলধন বা নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না, যা উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। একই সাথে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির খবর আমানতকারীদের মধ্যেও আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেয়ায় তারল্যচাপ বাড়ছে। এই ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংকগুলোকে আন্তঃব্যাংক বাজার থেকে উচ্চ সুদে অর্থ ধার করতে হচ্ছে, যার প্রভাবে কল মানি রেট প্রায় ১০ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও উত্তরণের পথ

ব্যাংকগুলো যখন তারল্য সঙ্কটের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে পারছে না, তখন তারা সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ মনে করছে। এর ফলে সরকার ব্যাংক খাত থেকে সহজে ঋণ পেয়ে যাচ্ছে (২৪.৬১% প্রবৃদ্ধি), যা বেসরকারি খাতকে (৪.৯৮% প্রবৃদ্ধি) পুরোপুরি ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বঞ্চিত করছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ২৫.৪২% কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ব্যাংকগুলোর এই ডলার ও টাকার তারল্য সঙ্কট। নতুন কারখানা না হলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, যার ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪%-এর ঘরেই আটকে থাকার ঝুঁকিতে পড়বে। এ ছাড়া ৩২% খেলাপি ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়, যা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জোরপূর্বক একীভূতকরণ অথবা দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বাজেটোত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে “আপেক্ষিক বহিঃখাতের স্থিরতা বনাম অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ঝুঁকি”-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। একই সাথে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ কমিয়ে আনা এবং ডলারের বিনিময় হার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে স্থিতিশীল রাখা প্রয়োজন, যাতে বেসরকারি খাত পুনরুজ্জীবিত হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের গতি সচল থাকে।