আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
বর্ষা মৌসুমে দেশের বৃহত্তম হাওরাঞ্চলে নৌযান চলাচল ও জনসমাগম বাড়লেও কিশোরগঞ্জের হাওরজুড়ে একের পর এক হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা, নৌ-ডাকাতি, অবৈধ বালু উত্তোলন, পানিতে ডুবে মৃত্যু, শিশু নির্যাতন ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। বাজিতপুর, নিকলী, ভৈরব, মিঠামইন ও করিমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক এসব ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌপথে টহল, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ভৈরব উপজেলার আকবরনগর ও মিলারচর এলাকায়। বাজারের নামকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ গত ২৭ জুলাই টেঁটা-বল্লমের সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্থানীয়দের দাবি, এতে তিনজন নিহত ও বহু মানুষ আহত হন। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে দু’জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।
একই সময়ে বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুর ইউনিয়নের খাটেরা হাটি গ্রামের নাছির মিয়ার রহস্যজনক মৃত্যু নিয়েও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, মাছ ধরার কথা বলে ডেকে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। দুই দিন পর নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদি হয়ে মামলা করেছেন। পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে এবং অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে।
নিকলী উপজেলায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গত ১৮ জুলাই স্থানীয় বিএনপি নেতা কাসেম আলী নিহত হন। এ ঘটনায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীতীর ভাঙন, মৎস্যসম্পদের ক্ষতি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এর পেছনে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
অন্য দিকে, মিঠামইন উপজেলা বিএনপির (পদ স্থগিত) সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে বলে জানিয়েছে।
হাওরাঞ্চলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। চলতি মৌসুমে নিকলী, মিঠামইন, করিমগঞ্জ, বাজিতপুর, কটিয়াদী ও ভৈরবসহ বিভিন্ন এলাকায় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাসহ একাধিক ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা গেছেন। স্থানীয়দের মতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, অসচেতনতা এবং পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জামের অভাব এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
নৌপথেও অপরাধ বাড়ছে। গত ৭ জুন মিঠামইন-করিমগঞ্জ নৌপথে পর্যটকবাহী একটি ট্রলারে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এর এক মাস পর করিমগঞ্জে একটি শিশুর লাশবাহী নৌকাতেও ডাকাতির অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় যাত্রীদের নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মালামাল লুট করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের পৃথক দু’টি ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। বাজিতপুর ও নিকলীতে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি মাদক কারবার, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বাজিতপুর থানার ওসি এস এম শহিদুল্লাহ জানান, বিভিন্ন ঘটনায় মামলা রুজু করে তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারের কার্যক্রম চলছে। সদ্য ভৈরব থানায় যোগ দেয়া ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, আকবরনগর-মিলারচরের সংঘর্ষের পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।



