৪.১৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি : শিল্পে বড় ধাক্কা

বিবিএসের হালনাগাদ তথ্য

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • মাথাপিছু আয় বেড়ে ৩ হাজার ২০ ডলার
  • জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত কমেছে ১.৫৪ শতাংশ

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.১৪ শতাংশ। একই সময়ে দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ২০ ডলারে। তবে প্রবৃদ্ধির এই চিত্রের পাশাপাশি অর্থনীতিতে কিছুটা চাপের ইঙ্গিতও মিলেছে। বিশেষ করে বৃহৎ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি এক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সাথে জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাতও কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বর্তমান বাজারমূল্যে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা যা ডলারের হিসাবে প্রায় ৫০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা বা ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। বিবিএস গতকাল সোমবার এই তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্যমতে, স্থির মূল্যে গত অর্থবছরের জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৪ লাখ ৬২ হাজার সাতশ’ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধির ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হয়েছে। যদিও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম।

কৃষি ও সেবায় বাড়লেও শিল্পে প্রবৃদ্ধির পতন

জিডিপির প্রধান তিনটি খাত হলো কৃষি, শিল্প এবং সেবা। প্রধান খাতভিত্তিক তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৭৮ শতাংশ যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে ছিল ২.৪২ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার ০.৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাময়িক হিসাব অনুযায়ী গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৮৬ শতাংশ যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে ছিল ৩.৭১ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার ০.৮৫ শতাংশিয় পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। অন্য দিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪.৫৯ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী ছিল ৪.৩৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হার ০.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কমেছে বিনিয়োগ, দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়

বিবিএসের তথ্য থেকে জানা গেছে, গত অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট বিনিয়োগ ১৭ লাখ ৯ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা, দেশজ সঞ্চয় ১৩ লাখ আট হাজার ৫৭০ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয়ের পরিমাণ ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। জিডিপির সাথে বিনিয়োগ, দেশজ সঞ্চয় এবং জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৭.৯৩ শতাংশ, ২১.৩৮ শতাংশ এবং ২৬.৯৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী এসবের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ২৮.৫৪ শতাংশ, ২১.৯৮ শতাংশ এবং ২৭.৬৭ শতাংশ। উল্লেখ্য, গত অর্থবছরের তুলনায় বিনিয়োগ কমেছে ০.৬১ শতাংশ, দেশজ সঞ্চয় কমেছে ০.৬০ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় কমেছে ০.৭৪ শতাংশ।

মাথাপিছু আয় বেড়েছে

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৮ হাজার ৮৭৩ টাকা বা তিন হাজার ২০ ইউএস ডলার। পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল তিন লাখ ৩৪ হাজার ৫১১ টাকা বা দুই হাজার ৭৬৯ ইউএস ডলার। ডলার মূল্যের হিসাব প্রণয়নের ক্ষেত্রে জুলাই-মার্চ ২০২৫-২৬ সময়ের ডলারের গড় বিনিময় হার (১২২.১৪ টাকা/ইউএস ডলার) ব্যবহার করা হয়েছে।

কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ২.৭৮ শতাংশ

বিদায়ী অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী জিডিপিতে চলতি মূল্যে কৃষিখাতের অবদান ১১.৮৫ শতাংশ। এ খাতটি চারটি উপখাতের সমন্বয়ে গঠিত। যেমন : (ক) শস্য ও উদ্যান (খ) পশুপালন (গ) বন ও সংশ্লিষ্ট সেবা এবং (ঘ) মৎস্য আহরণ। হিসাব অনুযায়ী স্থির মূল্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৃহৎ কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৭৮ শতাংশ। যা বিগত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে ছিল ২.৪২ শতাংশ। আর শস্য ও উদ্যান এ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় স্থির মূল্যে কৃষি খাতের শস্য ও উদ্যান উপখাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.০৮ শতাংশ।

প্রধান ছয়টি ফসলসহ মোট ১৪৬টি ফসলের হিসাবের ভিত্তিতে শস্য ও উদ্যান উপখাতের জিডিপি প্রাক্কলন করা হয়ে থাকে। তবে বিবিএস বলছে সাময়িক হিসাব প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে হিসাব প্রাক্কলনের সময় পর্যন্ত হার্ভেস্টেড ফসলের হালানাগাদ হিসাব ব্যবহারের পাশাপাশি অবশিষ্ট ফসলের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরের উৎপাদনকে চলতি বছরের সাময়িক উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে।

আউশ এবং পাটের উৎপাদনে পতন

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব প্রাক্কলনের ক্ষেত্রে প্রধান ফসলের মধ্যে আউশ এবং পাটের চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে আউশের উৎপাদন প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৭.০৮ লক্ষ মেট্রিক টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিলো ২৭.৯৩ লক্ষ মেট্রিক টন, পাট ফসলের ক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের উৎপাদন ১৬.২৪ লক্ষ মেট্রিক টনের স্থলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাক্কলিত উৎপাদন হয়েছে ১৫.৯৪ লক্ষ মেট্রিক টন, যা ১.৮৫ শতাংশ কম। গত অর্থবছরের সাময়িক জিডিপি প্রাক্কলনের জন্য আমনের সাময়িক উৎপাদন ধরা হয়েছে ১৭৩.২৭ লক্ষ মেট্রিন টন, যা পরবর্তীতে চূড়ান্তভাবে প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭৩.৫৯ লক্ষ মেট্রিক টন। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে আমনের উৎপাদন বেড়েছে ৫.১১ শতাংশ। বোরো, আলু এবং গমের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী বছরের উৎপাদনকে বিদায়ী অর্থবছরের সাময়িক উৎপাদন হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। অপ্রধান ফসলের ক্ষেত্রে সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে শাকসবজির উৎপাদন বেড়েছে ৩.৩৯ শতাংশ, ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৫.৯৭ শতাংশ এবং মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন বেড়েছে ১.৪০ শতাংশ।

সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি, সামনে চ্যালেঞ্জ

বিবিএসের সাময়িক হিসাব বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে জিডিপির আকার বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং সেবা ও কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। অন্য দিকে বৃহৎ শিল্পের প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাতও হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে বৃহৎ শিল্পে ৫.১৪ শতাংশ থেকে ১.৯৭ শতাংশে প্রবৃদ্ধি নেমে আসার বিষয়টি অর্থনীতির উৎপাদন ও বিনিয়োগ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। একই সাথে জাতীয় সঞ্চয়ের অনুপাত কমে যাওয়াও নজর দেয়ার মতো বিষয়। ফলে ৪.১৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে অর্থনীতির পুরো চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি যেমন ইতিবাচক সূচক, তেমনি শিল্পের গতি, বিনিয়োগের মান, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার মতো বিষয়গুলোও অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ধারণে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিবিএসের সাময়িক হিসাব তাই একদিকে অর্থনীতির সম্প্রসারণের তথ্য দিচ্ছে, অন্য দিকে প্রবৃদ্ধির গতি ও কাঠামোগত সক্ষমতা নিয়ে সতর্ক হওয়ার বার্তাও দিচ্ছে।