মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সঙ্ঘাতেও ইসরাইল ভারত সম্পর্ক গভীর হচ্ছে

অ্যামনেস্টির বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, ভারত এখন ইসরাইলের অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসরাইলের সাথে ভারতের ক্রমবিকাশমান সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে কিভাবে তা আরো গভীর হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে। গাজায় সামরিক অভিযানের কারণে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া ইসরাইলের সাথে ভারত কেন আরো ঘনিষ্ঠ বন্ধন তৈরি করছে? ওই অভিযানে অঞ্চলটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই শিশু।

নরেন্দ্র মোদির অধীনে, ইসরাইলের সাথে ভারতের সম্পর্ক একটি ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে; বিশেষ করে এমন একটি দেশের জন্য, যে দেশটি একসময় ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে ছিল এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। বিষয়টি আরো ভালোভাবে বুঝতে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ এবং ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক স্ট্যানলি জোনি বলেছেন, এটি শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পরিবর্তন নয়, ‘এটি কৌশলগত এবং প্রতিরক্ষা স্তরেও ঘটেছে।’

সম্প্রতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি অনুসন্ধানে ভারতের ভূমিকার এই বিবর্তন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ভারত এখন ইসরাইলের অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি মূল অংশ। এটি একটি মৌলিক পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। বছরের পর বছর ধরে, নয়াদিল্লি মূলত ইসরাইলি অস্ত্রের একটি প্রধান ক্রেতা ছিল। কিন্তু অ্যামনেস্টির মতে, যৌথ উদ্যোগ এবং উৎপাদন অংশীদারত্বের মাধ্যমে এটি এখন ইসরাইলের অস্ত্র উৎপাদনে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী’। গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতের সম্পৃক্ততার মাত্রা সম্পর্কে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিশদ বিবরণ।

এতে আরো বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ ভারতীয় সংস্থাগুলো ইসরাইলি সামরিক সরবরাহকারীদের কাছে ড্রোন ওয়ারহেড, আর্টিলারি শেলের খোল, ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সামরিক যানের উপাদান সরবরাহ করেছে, যদিও এই উপাদানগুলো গাজায় মোতায়েন করা অস্ত্রে ব্যবহৃত হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

প্রকাশ্যে উপলব্ধ চালানভিত্তিক বাণিজ্য তথ্য পরীক্ষা করে অ্যামনেস্টি বলেছে, তারা ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫-এর মধ্যে ভারতীয় কারখানা থেকে ইসরাইলি সামরিক সরবরাহকারীদের কাছে পাঠানো কয়েক লাখ অস্ত্রের যন্ত্রাংশের সন্ধান পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে: সামরিক মানের অস্ত্রের জন্য ৩৯০,৫১৬টি ছোট অস্ত্রের যন্ত্রাংশ, বিস্ফোরক অস্ত্রের ৫৬৪,৯৭০টি যন্ত্রাংশ ও সামরিক যানবাহনের ২৯৮টি যন্ত্রাংশ।

ব্রিটেনসহ অনেক পশ্চিমা দেশ যুদ্ধে ইসরাইলের আচরণের কারণে দেশটিতে অস্ত্র সরবরাহ সীমিত বা নিষিদ্ধ করেছে। তাদের মতে, এই অস্ত্রগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হতে পারে বা তা সহজতর করতে পারে। (ইসরাইলে পাঠানো বড় আকারের অস্ত্র সরবরাহের বেশির ভাগই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।)

জাতিসঙ্ঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন সেপ্টেম্বরে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে এবং এই বছরের শুরুতে আরেকটি কমিশন জানায় যে, ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্য করে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।

তথাপি, কিছু বিক্ষিপ্ত গণমাধ্যমে প্রচার সত্ত্বেও, অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনটি ভারতে কোনো বড় মাপের জনবিতর্ক বা রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়নি। জোনি মনে করেন, মোদির নির্বাচকমণ্ডলীর ইসরাইলের প্রতি সমর্থনের ফলেই এমনটা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘হিন্দুত্ব ও জায়নবাদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট আদর্শগত মিল রয়েছে।’ তিনি যুক্তি দেন যে, ভারত ও অন্যত্র ডানপন্থী মহলে ইসরাইলকে ইসলামের বিস্তারের বিরুদ্ধে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে ক্রমবর্ধমানভাবে দেখা হচ্ছে।

হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলের প্রশংসা করে আসছে এবং এটিকে একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের মডেল হিসেবে দেখে, যা একটি অস্থিতিশীল পরিবেশে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারে। লেখক পঙ্কজ মিশ্র ২০১৭ সালের একটি প্রবন্ধে এই সখ্যতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন যে, তার দাদু ছিলেন সেইসব উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে একজন, যারা মুসলমানদের সাথে কিভাবে মোকাবেলা করতে হয় তার একটি উদাহরণ হিসেবে ইসরাইলকে দেখতেন, ‘সেই একমাত্র ভাষায় যা তারা বুঝত, শক্তি এবং আরো শক্তি।’

গাজার যুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন এনেছে বলে মনে হয় না। জুনে প্রকাশিত পিউ রিসার্চের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রতিকূল দৃষ্টিভঙ্গির (২৮ শতাংশ) চেয়ে অনুকূল দৃষ্টিভঙ্গির (৩২ শতাংশ) ভারতীয়দের সংখ্যাই বেশি। এটি যুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন হ্রাসের বিপরীত চিত্র।

অন্য দিকে, মোদি নেতানিয়াহুর সাথে একটি ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। ২০১৭ সালে, তিনি হলেন ইসরাইল সফরকারী প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এবং চলতি বছরের শুরুতে মোদির ইসরাইল সফরটি হয়েছিল ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের ওপর হামলা চালানোর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে। রানওয়েতে মোদির নেতানিয়াহুকে আলিঙ্গন করার দৃশ্য এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তে নয়াদিল্লির লক্ষণীয়ভাবে নীরব প্রতিক্রিয়া, ভারতের রাজনৈতিক মহলের অবস্থান সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। বিষয়টি কারো চোখ এড়ায়নি। জুলাই মাসে, মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স যখন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বে ইসরাইলের ‘একমাত্র শক্তিশালী মিত্র’ বলে নেতানিয়াহুকে তিরস্কার করেন, তখন নেতানিয়াহু পাল্টা জবাব দেন: ‘আমাদের আরো কিছু বন্ধু আছে, যেমন ভারত নামের একটি ছোট দেশ। এর জনসংখ্যা ১.৪ বিলিয়ন এবং সেখানে আমাদের বিপুল সমর্থন রয়েছে।’

ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ সম্পর্কে ভারত সরকার এর আগে সরাসরি উত্তর দিতে অস্বীকার করেছে। ২০২৪ সালে সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন যে এই তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং সামরিক সরঞ্জাম রফতানি ‘জাতীয় স্বার্থ’ দ্বারা পরিচালিত হয়। অ্যামনেস্টি তিনটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভারতীয় সংস্থা মুনিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড, ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড এবং অ্যাডভান্সড ওয়েপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেডকে চিহ্নিত করেছে, যারা ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। সংস্থাটির মতে, এটি ভারতকে ‘গাজায় চলমান গণহত্যায় জড়িত থাকার’ বিপদের মুখে ফেলতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এর জবাবে বলেন যে, ভারতের রফতানি জাতীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

এই বিরোধিতা মূলত মানবাধিকারকর্মী, ছাত্র সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, ভারতের বামপন্থী দল এবং কংগ্রেস পার্টির পক্ষ থেকে এসেছে। আদালতও কোনো প্রতিকার দেয়নি। ২০২৪ সালে, একদল সরকারি কর্মকর্তা, কর্মী এবং শিক্ষাবিদ ইসরাইলে ভারতের সামরিক রফতানি স্থগিত করার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। আদালত এই মামলাটি খারিজ করে দেয় এবং রায় দেয় যে বিষয়টি নির্বাহী বিভাগের বিবেচনার মধ্যে পড়ে। স্টানলি জোনি বলেন, ‘ইসরাইল সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, ভারতে ইসরাইলের সাথে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে কোনো ক্ষোভ দেখা যায় না।’ তিনি মনে করেন, এটি একটি লক্ষণ যে ভারতে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক বিতর্কগুলো নৈতিক গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই সময়ে ভারত শুধু ইসরাইলে অস্ত্রই পাঠায়নি। হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিকও ইসরাইলে গেছেন, অনেক ক্ষেত্রে ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর পর দেশটিতে প্রবেশে নিষিদ্ধ ফিলিস্তিনিদের শূন্য স্থান পূরণ করতে। গত বছর, সরকার সংসদকে জানিয়েছিল যে ২০২৩ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির পর নির্মাণকাজ এবং সেবাযতেœর কাজে নিযুক্ত ২০ হাজারের বেশি ভারতীয় শ্রমিক ইসরাইলে চলে গেছেন।

এ দিকে ভারতও ইসরাইল থেকে তার নিজস্ব অস্ত্র ক্রয় জোরদার করেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নয়াদিল্লি ছিল ইসরাইলের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ক্রেতা, যা মোট অস্ত্র বিক্রির ২৯ শতাংশ।

কিন্তু জোনির মতে, ইসরাইলের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার একটি মূল্য দিতে হচ্ছে। ইরানযুদ্ধ ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে এর ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে, যেখানে একটি বিশাল ভারতীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠী বাস করে। ‘ভারতকে ইসরাইলের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হবে, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি,’ তিনি বলেন এবং যোগ করেন যে, ভারতকে তার নিজস্ব স্বার্থ জোরালোভাবে রক্ষা করতে হবে।