শেখ দীন মাহমুদ পাইকগাছা (খুলনা)
পাইকগাছার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র কপিলমুনিকে ঘিরে কপোতাক্ষের ওপর সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি বিগত ২৬ বছরেও। দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০০ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক শেষ হওয়ার পর কেটে গেছে আরো দুই যুগ। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে এক কোটি ৬৭ লাখ ৭২২ টাকা উত্তোলনের পর নদের নাব্যতা হ্রাসের অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয় এর সামগ্রিক কার্যক্রম।
ব্রিজ নির্মাণকাজ শেষ করতে দুই পাড়ের মানুষের গণদাবির প্রেক্ষিতে সেখানে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য এলজিইডির উচ্চপর্যায়ের একটি টিম বিগত ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা সেখানে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিজাইনসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিভিন্ন ধরনের পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ করেন। কিন্তু তার পরও কেটে গেছে আরো তিন বছর। এর মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পর নির্বাচনে ফের বিএনপির সরকার গঠন। ইতোমধ্যে খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ব্রিজের সম্ভাব্যতা নিয়ে জোর সুপারিশ করেন। ফের আশায় বুক বাঁধতে শুরু করে অবহেলিত জনপদের দুই পাড়ের মানুষ।
কপোতাক্ষের কপিলমুনিকেন্দ্রিক সেতুর বাস্তবায়ন হলে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হবে কপিলমুনির সাথে। বর্তমানে দু’টি রোড ক্রস করে ভোমরা থেকে কপিলমুনির দূরত্ব প্রায় ৪০-৪৫ কিলোমিটার। সেতুর বাস্তবায়নে কোনো ক্রসরোড ছাড়াই দূরত্ব কমে আসবে অর্ধেকে। এতে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের দক্ষিণের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিককেন্দ্র কপিলমুনি হয়ে উঠবে বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক জোনে। হাট ও বাজার ব্যবস্থাপনায় যোগ হবে নতুন নতুন এলাকা। যেখান থেকে এর সুবিধা পৌঁছে যাবে সাতক্ষীরার আশাশুনি, তালা, খুলনার পাইকগাছা, কয়রা, ডুমুরিয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা ও খুলনা শহরের সাথে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত হিমায়িত চিংড়ি, কাঁকড়া, কুঁচের উৎপাদনস্থল সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট হলেও দীর্ঘ দিনেও এর কোনো নির্দিষ্ট জোন গড়ে ওঠেনি। সেতুটিকে কেন্দ্র করে জনপদের পারস্পরিক স্বার্থ সুরক্ষায় সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় গড়ে উঠতে পারে লবণ পানির চিংড়ি জোন হিসেবে।
জানা যায়, সেতু নির্মাণে এর আগের সরকার এক কোটি ৯৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা বরাদ্দ করে। পরে কাজের মানোন্নয়নে বরাদ্দ বাড়িয়ে দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা করা হয়। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সেতুটির নির্মাণ কাজ পান আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম অ্যাডভোকেট শেখ মো: নুরুল হকের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এন হক এসোসিয়েট। প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালে সেতু নির্মাণ কার্যক্রম শুরু করে। এরপর ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক কাজ করার পর আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা থেকে এক কোটি ৬৭ লাখ ৭২২ টাকা উত্তোলন করে এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।
বিষয়টি সে সময় আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা জটিলতায় বন্ধ থাকে সেতু নির্মাণ কাজ। কিন্তু নির্মাণকাজ বন্ধ হলেও নদের বুকে থেকে যায় সেতুর নির্মাণাধীন অন্তত দুই ডজন পিলার; যা পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ায় নদের জন্য। অতিদ্রুত এর নাব্যতা হারিয়ে রীতিমতো অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে খরস্রোতা কপোতাক্ষ। ২০১১ সালে কপোতাক্ষের নাব্যতা ফেরাতে সরকার প্রায় ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও নির্মিত পিলারগুলো অপসারণ করা হয়নি।
সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে স্থানীয় খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ জানান, কপোতাক্ষের ওপর কপিলমুনি-কানাইদিয়া সেতু নির্মাণ বাস্তায়নে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও দিয়েছেন। দীর্ঘ দিন ব্রিজটির বাস্তবায়নে তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষায় কাজ করা সাংবাদিক এস এম মুস্তাফিজুর রহমান পারভেজ জানান, তিনি দীর্ঘ দিন ধরে সেতুটির বাস্তবায়নে কাজ করতে গিয়ে দেখেছেন, সেতু নির্মাণে প্রকৃত পক্ষে কোনো বাধা নেই।
ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) কপিলমুনিতে কপোতাক্ষের ওপর সেতু বাস্তবায়নে নীতিগত সিদ্ধান্তে অটুট ও জনপ্রতিনিধি তথা সরকারের সদিচ্ছাই পারে বিস্তীর্ণ জনপদের সর্বস্তরের মানুষের প্রতীক্ষার বাস্তবায়ন করতে।



