- স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে শুরু হবে কার্যক্রম
- দুই দশক পর শক্তিশালী বিরোধী দলে প্রাণবন্ত হবে সংসদ
- জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে শুরু থেকেই উত্তাপের ইঙ্গিত
- রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করে ওয়াকআউট করতে পারেন জামায়াত জোটের এমপিরা
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার যাত্রা শুরু করছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। প্রায় দুই দশক পর শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতিতে গঠিত এই সংসদকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা, রাজনৈতিক কৌতূহল এবং নানা আলোচনার আবহ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান হয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান হচ্ছেন বিরোধীদলীয় নেতা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী সরকার ও কার্যকর বিরোধী দলের উপস্থিতি সংসদকে আরো প্রাণবন্ত ও কার্যকর করে তুলতে পারে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে শুরু থেকেই সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী জোট জামায়াত-এনসিপির মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ উত্তাপ সংসদ এবং রাজপথ দুই ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। ইতোমধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াকআউট করতে পারেন বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা।
স্পিকারের চেয়ার খালি রেখেই শুরু
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে শুরু হবে। সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন স্পিকার নির্বাচনের বিধান রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ব্যতিক্রম।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ফলে এবার স্পিকারের চেয়ার খালি রেখেই সংসদের কার্যক্রম শুরু হবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সংসদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী অধিবেশনের শুরুতে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা হবে। এরপর সংসদ নেতা কোনো একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য। অন্য একজন সংসদ সদস্য সেই প্রস্তাব সমর্থন করবেন। এরপর প্রস্তাবিত জ্যেষ্ঠ সদস্য অস্থায়ীভাবে অধিবেশনের সভাপতিত্ব করবেন এবং তার তত্ত্বাবধানেই নতুন স্পিকার নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এ ক্ষেত্রে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিয়ে আলোচনা
সরকারি দল থেকে স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নাম আলোচনায় এসেছে।
অন্যদিকে বিএনপি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। দলটির আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান গতকাল বলেন, ‘জুলাই সনদেই বলা আছে যে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খণ্ডিতভাবে এটা চাই না। আমরা চাই প্যাকেজ আকারে- জুলাই সনদের সবকিছু বাস্তবায়ন হোক এবং তার ভিত্তিতে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পারি।’
জানা গেছে, স্পিকার নির্বাচনের পর প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি করা হবে। ওই সময় নবনির্বাচিত স্পিকার রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ গ্রহণ করবেন। শপথ শেষে স্পিকার ফের অধিবেশন কক্ষে ফিরে এসে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
প্রথম দিনেই তিনি পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর নাম প্রস্তাব করবেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে এই সদস্যরাই সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
শোক প্রস্তাবে খালেদা জিয়া ও গণ-অভ্যুত্থানের শহীদরা
প্রথম দিনের কার্যসূচিতে শোক প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে স্থান পাচ্ছে। জানা গেছে, এ শোক প্রস্তাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করা হবে। তাদের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং রাজনৈতিক অবদান নিয়ে সংসদে আলোচনা শেষে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে।
১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে
অধিবেশনের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে।
এই কমিটিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা থাকবেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে- কোন অধ্যাদেশ বহাল থাকবে এবং কোনগুলো বাতিল হয়ে যাবে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে বিতর্ক
অধিবেশনের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের ভাষণের মাধ্যমে প্রথম দিনের কার্যক্রম মুলতবি করা হবে। তবে এই ভাষণ ঘিরেই ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের গতকাল বলেন, ‘আমরা মনে করি রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেয়ার নৈতিক অধিকার নেই। তিনি স্বৈরাচারের দোসর। বিএনপি কেন তাকে ভাষণ দিতে দিচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারছি না। আমাদের অবস্থান সংসদেই পরিষ্কার হবে।’
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রথম দিনেই সংসদে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সরকার ও বিরোধী দলের প্রস্তুতি বৈঠক
নতুন সংসদে নিজেদের ভূমিকা নির্ধারণ করতে বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা পৃথক বৈঠক করেছেন।
সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি দলের বৈঠকে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদ উপনেতা পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। স্পিকার পদে আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নাম এবং সংসদ উপনেতা পদে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম আলোচনায় এসেছে বলে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের এলডি হলে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ১৯ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রতীক্ষার পর নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সংসদ হবে কার্যকর, প্রাণবন্ত এবং জবাবদিহিমূলক। তিনি আরো বলেন, জাতীয় সব সমস্যার সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হবে সংসদ এবং এখানে গঠনমূলক বিতর্ক ও সমালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
ডেপুটি স্পিকার নিয়ে দ্বিধায় বিরোধী দল
অন্যদিকে বিরোধী দলের বৈঠকে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণ করা হবে কি না- তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
জুলাই সনদে দু’টি ডেপুটি স্পিকারের পদ থাকার কথা বলা হলেও বর্তমান সংবিধানে একটি ডেপুটি স্পিকারের পদ রয়েছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আগেই ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী দেয়া হবে কি না- সে বিষয়ে আজ সংসদেই সিদ্ধান্ত জানানো হতে পারে।
সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, অধিবেশনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। সংসদ ভবন ও আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বরাবরের মতো এবারো সংসদের প্রথম অধিবেশন দীর্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি আগামী এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে।
অধিবেশন শুরুর পর সাপ্তাহিক ছুটির কারণে দুই দিনের জন্য অধিবেশন মুলতবি থাকবে। আগামী ১৫ মার্চ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন ও আলোচনা শুরু হবে। এরপর আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অধিবেশন দুই সপ্তাহের জন্য মুলতবি থাকতে পারে। ঈদের ছুটি শেষে আগামী ২৯ মার্চ আবার সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন সংসদের রাজনৈতিক বাস্তবতা
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একই সাথে সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়লাভ করে প্রধান বিরোধী দলের আসনে।
প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক রহমান। একইভাবে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসছেন জামায়াতে ইসলামী আমির ডা: শফিকুর রহমান।
এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র ও তরুণদের সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টির ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হচ্ছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। বিরোধীদলীয় হুইপের দায়িত্ব পালন করবেন জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।
২ আসনের ফলাফল স্থগিত
এবার মোট ২৯৮টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে দু’টি আসনের ফলাফল এখনো স্থগিত রয়েছে। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের বিএনপি প্রার্থী যথাক্রমে সরোয়ার আলমগীর ও মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনের ফলাফল আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। ফলাফল ও গেজেট কবে প্রকাশ হবে তা নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রাণবন্ত সংসদের প্রত্যাশা
দীর্ঘ দুই দশক পর শক্তিশালী বিরোধী দল থাকায় এবারের সংসদ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রশ্নোত্তর পর্ব, পয়েন্ট অব অর্ডার, ওয়াকআউট এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
নতুন সংসদ সদস্যদের সংসদীয় রীতি ও আইন প্রণয়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা দিতে বিএনপি ইতোমধ্যে দুই দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে। সেখানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যদের সংসদের কার্যপ্রণালী ও বিধিবিধান সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় যাত্রা শুরু করা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে ঘিরে যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি সামনে রয়েছে নানা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও। সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গঠনমূলক বিতর্ক, সমঝোতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



