বিশেষ সংবাদদাতা
- ‘ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন হতে হবে বিশ^াসযোগ্য’
- সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী হবে সংস্কারের ধারাবাহিকতা : অর্থমন্ত্রী
বাংলাদেশ রাজস্ব, আর্থিক এবং মুদ্রাস্ফীতিজনিত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আরো তীব্র হয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকিং খাতের চাপ উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। ‘ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন হতে হবে বিশ^াসযোগ্য’- বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)।
সরকারের নতুন তহবিল-সমর্থিত কর্মসূচির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা সফর করেছে। এই সফরের শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতিনিধিদলটি সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সাথে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। এরপর আইএমএফের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে একথা বলা হয়। আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক ও আর্থিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা এবং কর্তৃপক্ষের সংস্কার অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে আলোচনা করা।
আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য রাজস্ব, আর্থিক খাত এবং মুদ্রাস্ফীতির চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এই চাপগুলো আরো বেড়েছে, যা আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি করেছে এবং ব্যাংকিং খাতের উচ্চ চাপের মধ্যে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে।
অব্যাহত রাজস্ব ও আর্থিক খাতের চাপের কারণে ২০২৭ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়াবে এবং মধ্যমেয়াদে তা ৩ শতাংশের নিচে থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করতে এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো মোকাবেলায় সংস্কার এগিয়ে নিলে মধ্যমেয়াদি সম্ভাবনার উন্নতি হবে।
ইভো ক্রজনার বলেন, ‘আইএমএফ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ঘটনাবলী এবং তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করেছে। এই তথ্য-অনুসন্ধানমূলক সফরটি কর্তৃপক্ষের নীতি পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আরো ভালোভাবে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। আগামী মাসগুলোতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্বব্যাপী পণ্যের উচ্চমূল্য এবং সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় মুদ্রাস্ফীতির চাপ নতুন করে বেড়েছে উল্লেখ করে আইএমএফ বলেছে, ভর্তুকির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইতোমধ্যেই সীমিত রাজস্ব পরিসরকে আরো সঙ্কুচিত করেছে। রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও, উচ্চ আমদানি ব্যয় বৈদেশিক হিসাবের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ব্যাংকিং খাতের চাপ উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
আইএমএফ দেয়া ২০২৫ সালের চতুর্থ অনুচ্ছেদ পরামর্শে চিহ্নিত নীতিগত অগ্রাধিকার দ্বারা এই সফরকালে কর্মকর্তাদের আলোচনা পরিচালিত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফ মনে করে, অগ্রাধিকারমূলক সামাজিক ও উন্নয়নমূলক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য আর্থিক সংস্থান তৈরি করতে শক্তিশালী রাজস্ব আহরণ এবং ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ প্রয়োজন। সুনির্দিষ্ট সামাজিক সহায়তা দুর্বল পরিবারগুলোর উপর রাজস্ব সংস্কারের প্রভাব প্রশমিত করতে সাহায্য করতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি এবং বিচক্ষণ রাজস্ব নীতি বজায় রাখা উচিত।
রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করতে ও আর্থিক সংস্থান তৈরি করতে এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাগুলো মোকাবেলায় সিদ্ধান্তমূলক সংস্কারের অভাবে আইএমএফ অনুমান করছেন যে, অর্থবছর ২০২৬-২৭-এ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৫ শতাংশে দাঁড়াবে এবং মধ্যমেয়াদে তা আরো দুর্বল হয়ে ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। ভবিষ্যতের ঝুঁকিগুলো নিম্নমুখী, যা ব্যাংকিং খাতের টানাপোড়েন, আর্থিক চ্যালেঞ্জ এবং বাহ্যিক চাপের সম্ভাব্য পারস্পরিক ক্রিয়াকে প্রতিফলিত করে বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী হবে সংস্কারের ধারাবাহিকতা-অর্থমন্ত্রী
সরকারের অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচির (প্রোগ্রাম) ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। আগে যেসব নীতিগত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর ওপরই এই কর্মসূচির ভিত্তি দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান (রেসপেক্ট টু দ্য ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট) বজায় রেখেই সংস্কারের কাজ পরিচালিত হবে। একই সাথে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে (সিকোয়েন্সিং) পরিবর্তন আনা হবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যখন যেটা প্রয়োজন হবে, তখন সেটাই করা হবে। এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বাকি পরিবর্তনগুলোও সময় ও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।



