সূচকের মিশ্র আচরণে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহ কাটল পুঁজিবাজারের

ডিএসইর শীষর্ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিএসইসির তদন্ত কমিটি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

লেনদেনে ধীরগতি এবং সূচকের মিশ্র আচরণেই চলছে সাম্প্রতিক পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহের মোট পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তিনটিতেই সূচকের অবনতি ঘটে দেশের দুই পুঁজিবাজারে। অপর দিকে এর আগের সপ্তাহে এক প্রকার গতিহীন ছিল বাজারগুলো। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কটের কারণেই দেশের অর্থনীতির কিছুটা গতিহীনতার কারণেই পুঁজিবাজার কিছুটা হলেও গতি হারাচ্ছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, উৎপাদনে ভাটা পড়লে শিল্প খাতের পাশাপাশি সেবা খাতেও তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। তারা মনে করেন এ মুহূর্তে অর্থনীতি এক সন্ধিক্ষণের মোকাবেলা করছে যার একটি প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখো যাচ্ছে দেশের পুঁজিবাজারে।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তিনটি সূচকের মধ্যে দু’টি কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে পারলেও অন্য সূচকটি অবনতির শিকার হয়। সপ্তাহটিতে পাঁচ কর্মদিবসের দু’টিতে সূচকের উন্নতি ধরে রাখা গেলেও তিনটি কর্মদিবস কাটে সূচকের অবনতিতে। এ সময় ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২২ দশমিক ৯৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। রোববার ৫ হাজার ৮৬০ দশমিক ৯৬ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে ৫ হাজার ৮৮৩ দশমিক ৯১ পয়েন্টে স্থির হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই্-৩০ সূচকটি দশমিক ৮৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকের অবনতি ঘটে ৩ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট।

সূচকের অবনতির কারণে গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনেও কিছুটা অবনতি ঘটে। এ সময় বাজারটির গত লেনদেন দাঁড়ায় ৯৯৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১৫ দমমিক ৫৯ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে বাজারটির গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ১৮১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তবে পাঁচ আগস্ট সরকারি ছুটির কারণে আগের সপ্তাহে কর্মদিবস ছিল চারটি। ফলে গত সপ্তাহে কর্মদিবস একটি বেশি থাকায় ডিএসইর মোট লেনদেন গত সপ্তাহে কিছুটা উন্নতি ঘটে। আগের সপ্তাপহের ৪ হাজার ৭২৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকার স্থলে গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন দাঁড়ায় ৪ হাজার ৯৮৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। গত মাসের শুরুর দিকে বাজারে গতি ছিল সম্প্রতি তা আর দেখা যাচ্ছে না। সে সময় প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এর লেনদেন এক হাজার ৬০০ টাকা ছাড়ালেও পরে ক্রমান্বয়ে এ গতি হারাতে থাকে। গত সপ্তাহের একদিন তা ৯০০ কোটিতে নেমে আসে।

খাতভিত্তিক লেনদেনে গত সপ্তাহে বস্ত্র খাতের শেয়ারের আধিপত্য ছিল। লেনদেনচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেনের ২২ দশমিক ১ শতাংশ করে দখলে নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে বস্ত্র খাত। ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ বীমা খাত। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ওষুধ ও রসায়ন খাতের দখলে ছিল লেনদেনের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রকৌশল ও ব্যাংক খাত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লেনদেনের ভিত্তিতে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে ছিল। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা বিবিধ খাতের দখলে ছিল মোট লেনদেনের ৭ শতাংশ।

ডিএসইতে গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে পাট খাতে। এ ছাড়া সেবা খাতে ৪ শতাংশ, বস্ত্র খাতে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, বিবিধ খাতে ২ দশমিক ৯ শতাংশ, সাধারণ বীমা খাতে ২ দশমিক ৭ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন এসেছে। গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক রিটার্ন এসেছে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, জীবনবীমা খাতে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ভ্রমণ খাতে ১ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ দিকে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়মিত নিয়োগ এবং সিকিউরিটিজে লেনদেনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সম্প্রতি এ বিষয়ে জারি করা এক আদেশে বিএসইসি জানিয়েছে, শেয়ারবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে এবং স্টক এক্সচেঞ্জের প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

কমিশনের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএসইর একজন শেয়ারহোল্ডার সদস্য বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আর্থিক অব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতেই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সাথে ডিএসইর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা, মহাব্যবস্থাপকসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সিকিউরিটিজে লেনদেন কিংবা এ ধরনের ব্যবসায় জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি এসব কর্মকর্তার পরিবারের সদস্য অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এমন কোনো শেয়ারবাজারভিত্তিক ব্যবসার সাথে যুক্ত আছেন কি না, যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় থাকবে।

ডিএসইর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের বিষয়ও তদন্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে ডিএসইর সংশ্লিষ্ট কমিটি, মনোনয়ন ও পারিশ্রমিক কমিটি এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা হবে। চুক্তিভিত্তিক পদে নিয়োগ, উপদেষ্টা নিয়োগ এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়েছে কিনা তাও অনুসন্ধানের আওতায় রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৯ অনুযায়ী গোপনীয়তা সংরক্ষণের বিধান ডিএসইর ব্যবস্থাপনা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা যথাযথভাবে পরিপালন করেছেন কিনা তা-ও পরীক্ষা করবে অনুসন্ধান কমিটি। অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য বিএসইসির তিন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা হলেন কমিশনের পরিচালক এ এস এম মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ শামসুর রহমান এবং সহকারী পরিচালক মো: মতিউর রহমান।

বিএসইসির আদেশ অনুযায়ী, আদেশ জারির তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।