রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে
‘আমার সাথে পেলে এবং প্লাতিনির দেখা হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশি সময় কাছে যেতে পেরেছি পেলের।’ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশী মোহাম্মদ জাকিরের মুখ থেকে এই কথা শোনার পর আগ্রহটা বেড়েই গেল। কিভাবে তাদের এত কাছে যাওয়ার সুযোগ হলো এই বাংলাদেশীর। অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ জাযগায় থাকলে নানা উপলক্ষেই বিভিন্ন জনের দেখার সুযোগ হয় তারকাদের সাথে। তবে জাকিরের জন্য প্রেক্ষাপটটা ছিল ভিন্ন। ছাত্রজীবনে নিউ ইয়র্কের জেইকস রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন তিনি। প্রথমে ইয়র্ক কলেজে পরে সেন্ট জন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। জেইকস রেস্টুরেন্ট নামের এই খাবার হোটেলের মালিক ছিলেন ফিফার এক সাবেক কর্মকর্তা। আর জাতিসঙ্ঘের ক্রীড়া দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় নিউ ইয়র্কের জাতিসঙ্ঘ ভবনে এলে তখন ফিফা কর্মকর্তার ওই রেস্টুরেন্টে খেতে আসতেন পেলে। কারণ পেলে এবং ওই ব্যক্তি ছিলেন বন্ধু। জাতিসঙ্ঘ ভবন থেকে সামান্য দূরেই ছিল জেইকস রেস্টুরেন্টের অবস্থান। সেই সূত্রধরেই পেলের সেবা করা এবং তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল জাকিরের।
বরিশালের লোক জাকির। লেখাপড়া করার জন্য ১৯৮৫ সালে তিনি চলে আসেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম পাড়ের দেশেই আছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করতে আসা বাংলাদেশীরা কেউ রেস্টুরেন্টে কাজ করে। কেউবা অন্য পেশার সাথে সম্পৃক্ত হন।
জাকিরও লম্বা সময় কাজ করেছিলেন জেইকস রেস্টুরেন্টে। তখনই এই গ্রেট ফুটবলারদের সাথে দেখা করার সুযোগ। জানান, ‘আমাদের হোটেলটি চালাতেন ফিফা কর্মকর্তা সেই মালিকের ছেলে। আর ওই ফিফা কর্মকর্তার সাথে সম্পর্কের সূত্র ধরেই পেলে-প্লাতিনিকে কাছে পাওয়ার সুযোগ। আমাদের রেস্টুরেন্ট খুবই ব্যস্ত থাকত। খুব ভালো জায়গায় ছিল অবস্থান। আর পেলের জন্য আমাদের মালিক রেস্টুরেন্টের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি বরাদ্দ রাখতেন।’ যোগ করেন, ‘যেদিন পেলে আসতেন সেদিন ভোরেই মালিক আমাদের বলে দিতেন, আজ পেলে এই রেস্টুরেন্টে খেতে আসবে। তখন পেলের ওই বসার স্থানে আর কাউকে বসতে দেয়া হতো না।’ আরো জানান, ‘মালিক কিন্তু পেলের কাছ থেকে কোনো টাকাই নিতেন না। পুরোপুরি ফ্রি। তবে পেলে আমাদের টিপস দিতেন। এটা অবশ্য ব্রাজিলের তিনবার বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলারটি আমাদের মালিককে বলেই সম্মতিটি আদায় করে নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ফুটবল খেলতেন জাকির। তবে ঢাকার লিগে নয়। নিউ ইয়র্কে আসার পর এখানেই ফুটবল ক্লাব গড়েছিলেন। তা খেলাটির প্রতি ভালোবাসা থেকেই। জানান, ১৯৮৮ অথবা ১৯৮৯ সালের দিকে প্রথম যে দিন শুনলাম আমাদের রেস্টুরেন্টে পেলে আসবেন তখন আমিতো খুবই রোমাঞ্চিত। যা লেখা পড়েছি, পরে যার খেলা দেখেছি ভিডিওতে, আমিও যেখানে ব্রাজিলের সমর্থক, যে মানুষটি পুরো ফুটবল বিশ্ব মাতিয়ে গেছেন, দুনিয়াজুড়ে যার শত কোটি ভক্ত, তিনি আসবেন আমাদের রেস্টুরেন্টে, বুুঝুন কী হয়েছিল মনের অবস্থা। তবে দুঃখের বিষয়, তখনো এভাবে মোবাইলের যুগ ছিল না যে হুট করেই ছবি তুলে ফেলা যায়। তা ছাড়া আমাদের বলা ছিল পেলে এই রেস্টুরেন্টে খেতে আসবে এই কথাও বাইরে কাউকে বলা যাবে না। সাথে ক্যামেরা এনে ছবি তুলব সে সুযোগও ছিল না। তাই সব কিছুই গোপন রাখা হতো।
এরপরও কিংবদন্তি এই গ্রেট ফুটবলারের সম্পর্কে বলেন, ‘অত্যন্ত অমায়িক ও প্রচণ্ড রকম ভদ্র ছিলেন পেলে। কথা খুবই কম বলতেন। তবে যতটুকু বলতেন ধীরে সুস্থে এবং আন্তরিকতার সাথে। আমার খাবার সরবরাহ করার সময় উনার সাথে কথা বলতাম। অবশ্য প্রথমে রেস্টুরেন্টে এসেই আমাদের সাথে সৌহার্দ্য বিনিময় করতেন।’
জাকির জানান, আমরা কিন্তু অন্য কোনো সাধারণ ভোক্তার মতো উনার সাথে ব্যবহার করতাম না। যেন আমাদের আপনজন, দাদা বা নানাকে সেবা শুশ্রƒষা করছি। আর উনিও উনার চমৎকার ব্যবহার দিয়ে আমাদের মুগ্ধ করতেন। আমি যখন বললাম আমরা বাংলাদেশীরা আপনার এবং আপনার দেশ ব্রাজিল দলের প্রচণ্ড রকম ভক্ত, তখন খুবই খুশি হলেন। নিউ ইয়র্কে এলেই তিনি আমাদের রেস্টুরেন্টে আসতেন। তাই উনার সাথে আমাদের ভালো একটা সম্পর্ক হয়েছিল। আমাদের মাঝে মধ্যে আমাকে বলতেন, তোমরা লেখাপড়ার জন্য এ দেশে এসেছ। এরপর চেষ্টা করো নিজ দেশে কিছু করার। সেখানে বিনিয়োগ করার। আর তোমাদের সরকারকে বলবা যেন ফুটবলকে তৃণমূল পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর তাদের ভালো ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে। ওই ছেলেগুলো যারা গরিব তাদের রাজধানীতে এসে ফুটবল শেখার ব্যবস্থা করতে।’ জাকির উল্লেখ করেন, পেলে বলেছেন আমিও কিন্তু গরিব ঘর থেকে উঠে এসেছি। আমি জানি এই উঠতি খেলোয়াড়দের রাজধানী পর্যন্ত এসে ফুটবলে ট্রায়াল দেয়ার জন্য বাস ভাড়া ট্রেন ভাড়া পর্যন্ত থাকে না। সে ব্যবস্থাও করতে হবে তোমাদের সরকারকে।
জাকির যোগ করেন, পেলে অধিকাংশ সময়েই একা আসতেন। তাই উনার সাথে কথা বলার সুযোগও বেশি হয়েছিল। ফ্রান্সের সাবেক অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনি দুইবার এসেছিলেন আমাদের হোটেলে। তবে তিনি দলবল নিয়ে এসেছিলেন। তারাও ফুটবলার। প্লাতিনি ছাড়া বাকিদের আমি চিনতামও না। আর বেশি লোক থাকায় প্লাতিনির সাথে কথাই হয়নি। শুধু খাবারই সরবরাহ করেছিলাম।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে দুনিয়া ছেড়ে চলে যান পেলে। তার মৃত্যু সংবাদে ভেঙে পড়েছিলেন জাকির। কান্না জড়িত কণ্ঠেই বলেন, যখন শুনলাম পেলে আর নেই, তখন মনে হচ্ছিল আমি আমার কোনো প্রিয়জনকে হারিয়েছি। আমার দাদা বা নানা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। উনি অন্য ধর্মের হলেও ওপাড়ে আমি উনার মঙ্গল কামনা করি।’ এরপরই জাকিরের তৃপ্তি, ‘সত্যিই খুব ভালো লাগছে উনার মতো একজন গ্রেট ফুটবলার, মহান মানুষকে সেবা দিতে পেরে।’



