নিজস্ব প্রতিবেদক
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ বাংলাদেশ। নদীভাঙন, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ ও নগর পরিবেশের অবক্ষয়, সবমিলিয়ে পরিবেশ এখন জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকারে পরিবেশ সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও তাদের ঘোষিত কর্মসূচি ও নীতিপ্রস্তাবে পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দলটির নেতারা বলছেন, উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে টেকসই রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। তাই ‘প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়ন’ হবে তাদের নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
নদী ও জলাশয় রক্ষায় পরিকল্পনা
বাংলাদেশের প্রাণ নদী। অথচ দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনায় অধিকাংশ নদীই মৃতপ্রায়। জামায়াতের ঘোষণায় নদী ও খাল দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।
দলটির প্রস্তাবে রয়েছে- নদী খনন ও পুনরুদ্ধার কর্মসূচি জোরদার, শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক, নদীদূষণে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, জলাভূমি ও খাল সংরক্ষণে বিশেষ টাস্কফোর্স। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব পদক্ষেপ কার্যকর হলে পানি সঙ্কট ও বন্যা ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ : বনভূমি উজাড় হওয়া দেশের পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল ও শিল্পায়নের চাপে বন কমছে। জামায়াত বন সংরক্ষণে সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ, নতুন বনাঞ্চল সৃষ্টি এবং পাহাড় ও সংরক্ষিত এলাকাকে ‘ইকো-সেনসিটিভ জোন’ ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছে।
দলটির মতে- বন উজাড়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, গ্রামভিত্তিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ ইউনিট, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নগর পরিবেশ : ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজ ও শিল্পকারখানা এর প্রধান উৎস। জামায়াতের পরিবেশ পরিকল্পনায় বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ, পুরনো ও দূষণকারী যানবাহন অপসারণ এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালুর কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া- বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক রিসাইক্লিং ব্যবস্থা, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, শহরে উন্মুক্ত সবুজ পার্ক ও জলাধার সংরক্ষণ, স্যানিটেশন ও বর্জ্য নিষ্কাশনে উন্নত অবকাঠামো। এসব পদক্ষেপকে ‘বাসযোগ্য শহর গঠনের পূর্বশর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে দলটি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু কৌশল : জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে জামায়াত। সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং গ্রামাঞ্চলে সৌর প্যানেল স্থাপনে ভর্তুকির প্রস্তাব রয়েছে।
তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে- সরকারি ভবনে সোলার সিস্টেম বাধ্যতামূলক, গ্রামীণ বিদ্যুতায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জলবায়ু তহবিলের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপও কমবে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা : পরিবেশবান্ধব কৃষিকেও গুরুত্ব দিয়েছে দলটি। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসার ও প্রাকৃতিক চাষাবাদে উৎসাহ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। মাটি ও পানির গুণগত মান রক্ষায় সচেতনতা কর্মসূচিও থাকবে।
এতে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা : তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশ রক্ষায় আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল- এটাই বাংলাদেশের বড় সমস্যা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও কঠোর মনিটরিং ছাড়া এসব পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু ঘোষণা নয়- সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ, জবাবদিহিতা, নাগরিক অংশগ্রহণ- এসব নিশ্চিত করতে পারলেই বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।
জামায়াতের ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রত্যাশা একটাই, কথা নয়, চাই কার্যকর উদ্যোগ।
কারণ পরিবেশ রক্ষা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা।


