মেসির ছায়া পড়েছিল তুরস্কের ওপর

Printed Edition
প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা লিওনেল মেসি দ্বিতীয় ম্যাচেও কি গোলের ছক কষছেন  : ইন্টারনেট
প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করা লিওনেল মেসি দ্বিতীয় ম্যাচেও কি গোলের ছক কষছেন : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক নিউ ইয়র্ক থেকে

মুসলিম বিশ্বের গর্ব তুরস্ক জাতীয় ফুটবল দল। তুরস্কই প্রথম মুসলিম দেশ যারা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেছিল। ২০০২ জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে তারা শেষ চারে উঠে এরপর তৃতীয় হয়েছিল স্থাননির্ধারণী খেলায়। তা কোরিয়াকে ৩-২ গোলে হারিয়ে। তুর্কিয়ে ফুটবলার হাকান সুকুর বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম গোলের মালিক। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ওই ম্যাচেই তিনি গোল করেছিলেন ম্যাচের ১১ সেকেন্ড বয়সে। তুরস্কের ক্লাব গ্যালাতাসারাই-ই প্রথম মুসলিম ক্লাব যারা ২০০০ সালে জিতেছিল উয়েফা কাপ। সেই তুরস্কই ২০০২ সালের পর আর কোয়ালিফাই করতে পারছিল না বিশ্বকাপে। অবশেষে এবার তারা টিকিট পায় মূল মঞ্চের। অথচ ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ২২-এ থাকা দলটির কাছে সবার বড় বেশি প্রত্যাশা থাকলেও করেছে চরম হতাশ। টানা দুই ম্যাচে হেরে তাদের বিদায়। তুর্কিয়ে তারকা ফুটবলাররা একটি গোলও করতে পারেনি। ৬২টি শট ও হেড নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের পোস্টে। তাদের আর্দা গুলার, কেনান ইলদিজ, হাকান কালহানোগ্লুদের ওপর যেন ভর করেছিল লিওনেল মেসির ব্যর্থতার ছায়া। ২০১০ বিশ্বকাপে মেসি পাঁচ ম্যাচে ২৯টি শট নিয়েও কোনো গোলের দেখা পাননি। তুর্কিয়েদের এবার হলো সেটা।

টানা ছয় বিশ্বকাপ খেলা মেসি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পথে। আর একটি গোল হলেই টপকে যাবেন ১৬ গোল করা জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। তবে মেসি যদি গোল খরায় না ভুগতেন ২০১০ বিশ্বকাপে, তাহলে আরো আগেই নতুন রেকর্ডটি করে ফেলতেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০১০ বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে মেসি ২৯টি শট নিয়েছিলেন। তবে কোনোটিই গোললাইন অতিক্রম করেনি। ১৬ বছর পর তুর্কিয়ে ফুটবলাররা হাঁটলেন মেসির সেই পথেই। তারা ৬২টি চেষ্টাতেও গোল পাননি। ফলে বিদায় গ্রুপ পর্ব থেকেই। মেসির আর্জেন্টিনা অবশ্য সেই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলতে পেরেছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে মেসির পাঁচ ম্যাচ ছিল নাইজেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, গ্রিস, মেক্সিকো এবং জার্মানির বিপক্ষে। এই ম্যাচগুলোতে মেসির তিনটি শট পোস্টে লেগে প্রতিহত হয়েছিল। বিপক্ষ কিপাররা বেশ কয়েকটি অসাধারণ সেভ করেছেন। বাকিগুলো অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে বা বারের ওপর দিয়ে যায়। এরপর জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে ০-৪ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় নেয় দিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে খেলা দলটি। মেসির সেই ২৯টি মিস কিন্তু একটি রেকর্ড। বিশ্বকাপের একটি আসরে কোনো একক ফুটবলারের ২৯টি প্রচেষ্টার পরও গোল না পাওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি।

বিশ্বকাপ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগ পর্যন্ত দারুণ ছন্দেই ছিল তুরস্ক জাতীয় দল। ৩১ মার্চ বাছাইয়ের প্লে-অফে কসভোর বিপক্ষে ১-০ তে জয়ের পর তারা দু’টি প্রস্তুতি মাচ খেলেছিল। দুই ম্যাচেই তাদের জয়। ১ জুন নর্থ মেসিডোনিয়াকে ৪-০ এবং ৬ জুন ল্যাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলাকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল। প্রীতিম্যাচে দ্ইু খেলায় ছয় গোল করা তুরস্ক এবারের বিশ্বকাপে একটি গোলও করতে পারল না অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। এই দুই দলের বিপক্ষে ৬২টি শট ও হেড নিয়ে কোনো গোল করতে পারেনি। উল্টো ডিফেন্সের দুর্বলতায় দুই ম্যাচে তিন গোল হজম। এতেই সর্বনাশ! প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ০-২ গোলে হারের পর প্যারাগুয়ের কাছে ০-১ গোলে হার। এর মধ্যে প্যারাগুয়ে ১০ জনে পরিণত হওয়ার পরও তাদের হারাতে পারেনি তুরস্ক। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে ম্যাচের সময় মুখ ঢেকে কথা বলায় ফিফার নতুন নিয়মে রেফারি লাল কার্ড দেখান মিগুয়েল আলমিরনকে।

আসলে স্রেফই কপাল মন্দ থাকায় তুরস্ককে এভাবে বিদায় নিতে হলো দুই ম্যাচেই হেরে। তাদের গোল প্রচেষ্টাগুলোর কোনোটি ক্রসবারে লাগছে, কোনোটি পোস্টে আঘাত হানছে আবার কোনোটি ছিল বিপক্ষ কিপার বরাবর। কোনোটিতে গোলরক্ষকের দুর্দান্ত সেভ। বেশ কয়েকটি প্রচেষ্টাতো অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদের ৩২টি গোলের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৩০টি চেষ্টা ব্যর্থ। একটি শটতো ক্রসবারে লেগে এরপর পোস্টে প্রতিহত হয়।

বিশ্বকাপে আসার আগ পর্যন্ত তুরস্ক ১০ খেলায় ছিল ২৫ গোল। এর মধ্যে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জর্জিয়াকে ৪-১ গোলে এবং প্রস্তুতি ম্যচে নর্থ মেসিডোনিয়াকে ৪-০ তে পরাজিত করা।

তুরস্কের ফরোয়ার্ড লাইনে এবার আছেন আর্দা গুলার। যিনি রিয়াল মাদ্রিদের খেলোয়াড়। রিয়ালের জার্সিতে তার ৭১ ম্যাচে ১৩ গোল। তুরস্ক জাতীয় দলের হয়েই তার গোল ৩২ ম্যাচে ছয়টি। মিডফিল্ডার কেনান ইলদিজ ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসের হয়ে ৯৮ ম্যাচে ১৯ এবং জাতীয় দলের জার্সিতে ২৯ ম্যাচে ৫ গোল করেছেন। অথচ তাদের বিশ্বকাপটা গোলহীন এবং জয়হীন অবস্থায় হার দিয়ে শেষ হলো। এখন শেষ ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সান্ত্বনার জয় পেলেই হলো।

তুর্কিয়ে লিগে বিশ্বকাপের বড় বড় তারকারা খেলেছেন, এখনো খেলছেন। ব্রাজিলের ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী গোলরক্ষক ক্লাউডিও তাফারেল, রোমানিয়ার বিশ্বকাপে খেলা ফুটবলার কার্পেথিয়ান ম্যারাডোনা খ্যাত জর্জ হ্যাজি গ্যালাতাসারাই ক্লাবে খেলেছেন। তাদের উপস্থিতিতেই দলটি ২০০০ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উয়েফা কাপে। যার বর্তমান নাম উয়েফা লিগ কাপ। সেই তুরস্কই ২০০২ সালের পর আর কোয়ালিফাই করতে পারছিল না বিশ্বকাপে। প্রতিবারই অল্পের জন্য বাছাই পর্ব ডিঙাতে ব্যর্থ হওয়া। অবশেষে ২৪ বছর পর খেলল এবারের বিশ্বকাপে। সবার আশা ছিল ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ২২-এ থাকা দলটির কাছে। অথচ দুই যুগ আগের সেমিফাইনালিস্ট দলকে এবার বিদায় নিতে হলো টানা দুই ম্যাচ হেরে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের নিয়মরক্ষার ম্যাচ।