বাংলাদেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসি (এসবিপিএলসি) আজও একটি বিদেশী নিয়ন্ত্রিত কোর ব্যাংকিং সলিউশনের (সিবিএস) ওপর নির্ভরশীল। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইন্টেলেক্ট এবং সোনালী ব্যাংকের যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি সোনালী ইন্টেলেক্ট লিমিটেড, দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাংকটির যাবতীয় প্রযুক্তি সেবা সরবরাহ করছে। এখানে ভারতীয় ইন্টেলেক্টের মালিকানা ৫১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে এক দিকে যেমন জাতীয় আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, অন্য দিকে কোটি কোটি টাকা প্রতি বছর দেশ থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে।
অসম চুক্তি ও অদ্ভুত মালিকানা কাঠামো : ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে কোর ব্যাংকিং সলিউশন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ইন্টেলেক্ট একটি জটিল প্রস্তাব দিয়ে, যৌথ মালিকানার ভিত্তিতে কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে মালিকানার ভারসাম্য ছিল স্পষ্টতই ভারতের পক্ষে : ইন্টেলেক্ট ৫১ শতাংশ, সোনালী ব্যাংক মাত্র ৩৫ শতাংশ। এই অসম চুক্তি কিভাবে অনুমোদিত হয়েছিল- সেটি আজও স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামোতে বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক সরাসরি একটি বিদেশী কোম্পানির সফটওয়্যার, প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণ নির্ভরতায় পড়ে যায়, যা তথ্য নিরাপত্তা এবং আর্থিক স্বকীয়তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অনিয়ম, বিলম্ব ও অপূর্ণতা : চুক্তি অনুসারে সিবিএস বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও ইন্টেলেক্ট তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়। আজও ট্রেজারি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম কার্যকরভাবে চালু হয়নি। অথচ এই অপূর্ণ সেবার জন্য প্রতি বছর প্রায় ৩০ কোটি টাকা ইন্টেলেক্টকে পরিশোধ করে যাচ্ছে সোনালী ব্যাংক।
এই অর্থ মূলত বাংলাদেশী বৈদেশিক মুদ্রা, এখন ভারতের ইন্টেলেক্ট কোম্পানির মুনাফা হিসেবে রফতানি হচ্ছে; যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য আরেকটি ধাক্কা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ইসলামিক ব্যাংকিংয়ে সুযোগ হারানো ও ‘আবাবিল’-এর দমন : যেহেতু ইন্টেলেক্টের কোনো পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক কোর ব্যাংকিং সলিউশন ছিল না, সোনালী ব্যাংক একটি পৃথক টেন্ডারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত ‘আবাবিল’ সফটওয়্যারকে নির্বাচন করে এবং ৫৮টি শাখায় ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো চালু করে।
ব্যবহারকারী ও কর্মকর্তাদের মতে, ‘আবাবিল’ অত্যন্ত কার্যকর ছিল এবং গ্রাহক সন্তুষ্টিও ছিল উচ্চ। তখন সোনালী ব্যাংকের বোর্ড সব শাখায় ইসলামিক ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় সোনালী ইন্টেলেক্টের নতুন ‘ইসলামিক মডিউল’ প্রদানের প্রতিশ্রুতির কারণে।
কিন্তু বাস্তবে, এই নতুন মডিউল এখনো অপূর্ণ, অপরীক্ষিত ও অনভিজ্ঞ। তবুও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ‘আবাবিল’ ব্যবহার বন্ধ করে ইন্টেলেক্টের অপরিণত সমাধান ব্যবহার শুরু করে। এই হঠাৎ সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো কার্যকর প্রশাসনিক যাচাই বা নিরাপত্তা পর্যালোচনা ছিল না।
গভর্নর ও চেয়ারম্যানের দেশত্যাগ ও দুর্ব্যবস্থাপনার শুরু : ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান দেশ ত্যাগ করেন। এই শূন্যতায় ব্যাংকের তৎকালীন এমডি কর্তৃক একতরফাভাবে আবাবিল বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। এর ফলে ইসলামিক ব্যাংকিং সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সৃষ্ট শত শত কোটি টাকার বাজার সম্ভাবনা হারিয়ে যায়।
আজও এই অস্বচ্ছ ও বিদেশনির্ভর কাঠামো বহাল রয়েছে। আর সাবেক এমডি দেশ ত্যাগ করে থাকায় জবাবদিহিতার কোনো সুযোগও আর নেই।
একটি জাতীয় সঙ্কটের ইঙ্গিত : একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং অবকাঠামো যদি একটি বিদেশী কোম্পানির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই নয়, জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। এর সাথে যুক্ত হয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অস্বচ্ছ চুক্তি, ও জনস্বার্থ বিরোধী সিদ্ধান্তের সমষ্টি।
যথাযথ তদন্ত ও জাতীয় স্বার্থে প্রযুক্তি নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছেন আর্থিক বিশ্লেষক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।



