ইরানে কৌশলগত পরাজয়ের আশঙ্কা বাড়ছে মার্কিন মিত্রদের

Printed Edition

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা মনে করছে, ছয় মাসে পা রাখা ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ একটি কৌশলগত পরাজয়ের দিকেই এগোচ্ছে। এই সঙ্ঘাতে সামরিক শ্রেষ্ঠত্বে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তবু ইরানে সেই শক্তিকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে না পারাকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে এক ধরনের দুর্বলতা হিসেবেই দেখছে মিত্র দেশগুলো। তাদের আশঙ্কা, ওয়াশিংটনের এই দুর্বলতায় উচ্ছ্বাস করবে রাশিয়া ও চীন। এ ছাড়া ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর মূল উদ্দেশ্যগুলো এখনো পূরণ হয়নি এবং বিশ্বজুড়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সঙ্কটে পড়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

এই মুহূর্তে তুলনামূলক কট্টরপন্থী এক সরকারের অধীনে ইরানকে অনেকটাই অনড় মনে হচ্ছে। মার্কিন হামলার মুখে দেশটির পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও— পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া, জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীও মূলত তেহরানের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল উভয়কেই দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে- আর এই সার্বিক বিশৃঙ্খলার জন্য দু’টি দেশ এখন একে অন্যকে দোষারোপ করছে। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল সীমিত রাখতে বাধ্য করছে। একই সাথে উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্র আরব দেশগুলোর জ্বালানি উৎপাদন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক আঘাত হেনেই চলেছে। এসব হামলায় ইতোমধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা হতাহতও হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘন ঘন লক্ষ্য পরিবর্তনের কারণে সামরিক ও কূটনৈতিক- উভয় ক্ষেত্রেই মিত্রদের আস্থা হারাচ্ছে ওয়াশিংটন। তারা বলছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে এমন এক ধারণা তৈরি করেছে যে ওয়াশিংটন বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী এক অনিশ্চিত ও অসংলগ্ন শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সাবেক পরিচালক রবিন নিবলেট বলেন, যুদ্ধের রূপ ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে, তবে এ পর্যন্ত যা অর্জিত হয়েছে তা ‘একটি কৌশলগত ক্ষতি এবং অত্যন্ত চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।’ তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং যারা নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে, তাদের জন্য এটি আবার প্রমাণ করল যে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না।’ নিবলেট আরো বলেন, যদি ইরানে ইসলামিক রিপাবলিকের পতনও ঘটে, তবুও ‘মানুষ ভুলবে না যে যুক্তরাষ্ট্রের অনির্ভরযোগ্য ও দোদুল্যমান পররাষ্ট্রনীতির কারণে তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।’

ইউরোপীয় মিত্ররা এখনো ভুলে যায়নি ট্রাম্পের সেই অঙ্গীকারের কথা- যেখানে তিনি ন্যাটোর এক মিত্র দেশের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলেছিলেন এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো জোট থেকে বেরিয়ে যাবে এমন হুমকি দিয়েছিলেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ওয়ায়েজ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারত্ব পুরোপুরি ছিন্ন করার মতো অবস্থায় না থাকলেও, তারা দেখছে এই যুদ্ধ কিভাবে তাদের নিজেদের নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ফলে তারা ইতোমধ্যেই বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করেছে; তারা ইরানের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

নিবলেট বলেন, বৈশ্বিক ব্যবস্থা যেভাবে চলছিল, তা অনেক দেশেরই পছন্দ ছিল না, কিন্তু অন্তত একটি ব্যবস্থা তো ছিল। তিনি বলেন, ‘এখন আমেরিকা নিজেকেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে প্রমাণ করেছে। আর সবাই এখান থেকে শিক্ষা নিচ্ছে ও আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে। সীমাহীন ও হঠকারী পররাষ্ট্রনীতির বলি হতে কেউই চায় না, আর এটাই [যুক্তরাষ্ট্রের] কৌশলগত পরাজয়।’

মিত্রদের নিরাপত্তার জামিনদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে বেশ কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেন আলী ভায়েজ। এর মধ্যে গত সপ্তাহে সৌদি আরবের সাথে এক ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হঠাৎ করে ট্রাম্পের দাবির পরিবর্তন ঘটার বিষয়টিও রয়েছে।

আলী ওয়ায়েজ বলেন, ‘সৌদি আরব ট্রাম্পের সাথে একটি পারমাণবিক চুক্তি করে, আর তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা থেকে সরে আসেন। এটাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসের সঙ্কট। এখন আর তাদের সামরিক পরাক্রম বা কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি কোনোটির ওপরই ভরসা করা যায় না।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা অত্যন্ত জরুরি এবং শেষ পর্যন্ত প্রবল সামরিক শক্তির মুখে তেহরান নতি স্বীকার করবেই। গত শুক্রবার তিনি বলেন, তার প্রত্যাশা- ইরান একসময় বুঝতে পারবে যে তারা আর মার্কিন আঘাত সহ্য করতে পারছে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের শর্তেই আলোচনায় বসবে। ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে যাব। আমরা তাদের অত্যন্ত শক্ত আঘাত করব। একটা সময়ে তারা বলতে বাধ্য হবে, ‘আমরা আর নিতে পারছি না।’”

ইরানিদের ওপর যেটুকু আস্থা ছিল, তা-ও তিনি হারিয়ে ফেলছেন বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তার অভিযোগ, ইরানিরা ‘সবসময় কথা বলতে চায়’, কিন্তু আলোচনার পর কথা রাখে না। তিনি বলেন, ‘তারা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং একপর্যায়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে।’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণভাবে আরো শক্তিশালী করেছিল এবং বিদেশে বাড়িয়েছিল তার প্রভাব। কিন্তু তারপর থেকে আমেরিকার সামরিক সাফল্যের খতিয়ান বেশ মিশ্র। ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো জায়গায় লড়াইয়ের ক্ষয়ক্ষতি ও যন্ত্রণা সহ্য করতে প্রস্তুত শত্রুপক্ষ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধও একই পথে হাঁটতে পারে, যেখানে ক্ষয়ক্ষতির বোঝা কমিয়ে পিছু হটার যুক্তিসঙ্গত কোনো বাহানা হয়তো শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই খুঁজতে হবে।

সাবেক মার্কিন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক ও বর্তমানে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এই সঙ্ঘাত ইতোমধ্যেই ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিরোধ সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে দুর্বল করেছে, মিত্রদের অসন্তুষ্ট করেছে এবং শত্রুপক্ষকে আনন্দিত করেছে। আর হরমুজ প্রণালী যদি সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবে চলে যায়, তবে এটি কোনো কৌশলগত পরাজয়ের চেয়ে কম কিছু হবে না।’ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মতো অতি-প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চরম ঘাটতি ইউক্রেনের ওপর পরোক্ষভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি রাশিয়া, চীন ও নেটো জোটকে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, অন্তত আগামী কয়েক বছর মিত্রদের সমরাস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা অনেকটাই কমে আসবে।

হেইসবুর্গ ও ওয়ায়েজ উভয়েই একমত হন যে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাটি চলছে ইরান ও ওমানের মধ্যে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে- যে প্রণালীটি এই দুই দেশের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। ওয়ায়েজ জানান, ইরান প্রণালীর উত্তরাঞ্চলীয় নৌপথের একক নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় পথটির যৌথ নিয়ন্ত্রণ চায়, যা তাদের এই জলপথে জাহাজ চলাচলের ওপর কার্যকরী ভেটো দেয়ার ক্ষমতা এনে দেবে। অন্য দিকে ওমান (যাদের ওপর সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব রয়েছে বলে ইরান মনে করে) ঐচ্ছিক পারাপার ফি চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যার বিপরীতে ইরান বাধ্যতামূলক ফি দাবি করছে।

ফ্রাঁসোয়া হেইসবুর্গ সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা এতদিন সমুদ্র আইনকে যেভাবে জেনে এসেছি, এটি হয়তো তার সমাপ্তি ঘটাতে যাচ্ছে।’ তিনি আরো উল্লেখ করেন, জন্মলগ্ন থেকেই সমুদ্রে অবাধ চলাচল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বার্থ ছিল, যা এখন গভীর ঝুঁকিতে পড়েছে।