গাজায় ‘টেকনোক্র্যাট সরকার’ গঠন, ট্রাম্পের সমর্থন

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • শান্তির আড়ালে গাজা ধ্বংসে ইসরাইল
  • গাজার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের ঘোষণা ট্রাম্পের

ফিলিস্তিনের গাজার প্রশাসন পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকার গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এই কমিটি গঠন করা হয় বলে জানিয়েছে মিসরীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল কাহেরা নিউজ। খবরে বলা হয়, ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই নির্বাহী কমিটির প্রধান করা হয়েছে ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীর অঞ্চলের বাসিন্দা ও সুপরিচিত প্রকৌশলী আলি আবদুল হামিদ শাথকে। তিনি ব্যতীত অন্যদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এ দিকে গাজা পরিচালনায় আলি শাথের নেতৃত্বে বানানো ‘টেকনোক্র্যাট সরকারকে’ সমর্থন দেয়ার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেয়ার পর বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এই সমর্থনের কথা জানান।

ট্রাম্প বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গাজা পরিচালনায় নবনিযুক্ত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক গভর্নমেন্ট, দ্য ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজাকে সমর্থন জানাচ্ছি, এই কমিটি আন্তর্জাতিক বোর্ডের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধির সহায়তায় পরিচালিত হবে।

গাজা যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী মিসর, কাতার ও তুরস্ক জানিয়েছে, গাজার এই নতুন টেকনোক্র্যাট কর্তৃপক্ষ ১৫ সদস্যের হবে। এর নেতৃত্বে থাকবেন আলি আবদুল হামিদ শাথ। প্রকৌশলী হামিদ শাথ একসময় ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরে ক্ষমতাসীন ফাতাহ বা প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটির (পিএ) নেতৃত্বাধীন সরকারের উপ পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন।

অন্য দিকে গাজার শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য ১৫ সদস্যের ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি ঘোষণার পর শান্তি পরিষদ বা বোর্ড অব পিস গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। টেকনোক্র্যাট কমিটি বোর্ড অব পিসের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। ট্রাম্প নিজেই এই বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শান্তি পরিষদ গঠনের বিষয়টি নিজের মালিকানাধীন ট্রুথ সোস্যালে নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘এটি ঘোষণা করতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের যে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠিত হয়েছে। এই পরিষদের সদস্যদের নাম শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।’’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, এটি যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে গঠিত সবচেয়ে মহান এবং মর্যাদাপূর্ণ পরিষদ।’

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গাজায় ‘নীরব গণহত্যা’ : রোগ ও অনাহারে মৃত্যু

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় মৃত্যুর ধারা থামেনি। ক্যান্সার রোগী নাজাত সাঈদ আল-হেসির মতো হাজারো মানুষ ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, প্রয়োজনীয় ওষুধের ৭০ শতাংশের বেশি অনুপস্থিত। মিডলিস্ট আই জানায়, ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘শব্দহীন, ধীরগতির গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

মিডলিস্ট আই আরো জানায়, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনে ৩৯ হাজারের বেশি শিশু এক বা উভয় অভিভাবক হারিয়েছে। এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় এতিম সঙ্কট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিভাবক হারানো শিশুদের মধ্যে ভয়, বিচ্ছিন্নতা, দায়িত্বের আগাম বোঝা ও মানসিক ট্রমা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। অনেক শিশু খাদ্য সংগ্রহে প্রাণঝুঁকি নিচ্ছে। এই প্রজন্মের মানসিক ক্ষত যুদ্ধবিরতির পরও দীর্ঘ দিন বহন করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

শান্তির আড়ালে গাজা ধ্বংসে ইসরাইল

যুদ্ধবিরতি যদি হত্যা, পঙ্গুত্ব আর একটি সমাজের অবকাঠামো ধ্বংসের সুযোগ দেয়, তবে সেই শান্তির মূল্য কী? এই প্রশ্নই আজ গাজার বাস্তবতায় ঘুরে ফিরে সামনে আসছে। মিডলিস্ট মনিটরের মতামত কলামে এই মন্তব্য করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তথাকথিত যুদ্ধবিরতির আড়ালে ইসরাইল গাজা উপত্যকাকে আরো বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বা চাপিয়ে দেয়া ‘সম্মতিতে’ ভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা যায়- এমন অভিযোগ উঠেছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের ১২ জানুয়ারির এক খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল গাজায় অন্তত দুই হাজার ৫০০ ভবন গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ধ্বংসকাণ্ডের বড় অংশ ঘটেছে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায়। তবে হামাস-নিয়ন্ত্রিত অংশেও ভবন ধ্বংসের তথ্য পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, পূর্ব গাজার বহু এলাকা থেকে পুরো ব্লক, কৃষিজমি ও গ্রিনহাউজ মুছে গেছে।

গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-আস্তাল বলেন, ‘ইসরাইলি বাহিনী ঘরবাড়ি, স্কুল, কারখানা- সবকিছু ধ্বংস করছে। এর কোনো নিরাপত্তাগত যুক্তি নেই।’ ইসরাইলি বাহিনীর সাবেক কমান্ডার শাউল আরিয়েলিও স্বীকার করেছেন, এটি ‘নির্বিচার ধ্বংস’।

ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ মুভমেন্টের মতে, এই ধ্বংসকাণ্ডের লক্ষ্য মানবিক সঙ্কট বাড়ানো, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং সমষ্টিগত শাস্তি আরোপ। ইসরাইল ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার দোহাই দিয়ে বলছে, ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস করা হচ্ছে। কিন্তু বিবিসি ও আলজাজিরার তদন্তে দেখা গেছে, অনেক ভবন আগেই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল না।

চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, সামরিক প্রয়োজন ছাড়া দখলদার শক্তির বেসামরিক সম্পত্তি ধ্বংস নিষিদ্ধ। আইন বিশেষজ্ঞ আদিল হাক বলেন, যুদ্ধবিরতির মধ্যে এমন ব্যাপক ধ্বংস কোনোভাবেই ‘পরম সামরিক প্রয়োজন’ নয়। জাতিসঙ্ঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এই পরিস্থিতিকে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন- ‘‘এই তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনা ইসরাইলকে ‘কাজ শেষ করার’ সুযোগ দিচ্ছে।’’ শান্তির নামে সহিংসতা থামেনি, শুধু তার রূপ বদলেছে।

গাজার জন্য ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের ঘোষণা ট্রাম্পের

ফিলিস্তিনি গাজায় যুদ্ধ অবসানে মার্কিন-সমর্থিত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোস্যাল’-এ দেয়া এক পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন। পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এটি ঘোষণা করতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের যে, বোর্ড অব পিস গঠিত হয়েছে। এই বোর্ডের সদস্যদের নাম শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এটি যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে গঠিত সবচেয়ে মহান ও মর্যাদাপূর্ণ বোর্ড।’ যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য সম্প্রতি ১৫ সদস্যের একটি ফিলিস্তিনি ‘টেকনোক্র্যাট কমিটি’ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এই কমিটি মূলত ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে কাজ করবে।

পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে। হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বল এখন মধ্যস্থতাকারী, যুক্তরাষ্ট্রের গ্যারান্টার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোর্টে। এই কমিটিকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব এখন তাদের।’ গত ১০ অক্টোবর মার্কিন-সমর্থিত এই শান্তি পরিকল্পনা কার্যকর হয়। এর মাধ্যমে হামাসের হাতে থাকা পণবন্দীদের মুক্তি এবং ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে লড়াইয়ের অবসান ঘটে। বর্তমানে এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ চললেও ত্রাণসহায়তা ও সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে সংশয় কাটছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ৪৫১ জন নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের কাছে অমীমাংসিত প্রধান বিষয় হলো- গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। শান্তি পরিকল্পনায় এর উল্লেখ থাকলেও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো জানানো হয়নি। অন্য দিকে হামাস এখনো প্রকাশ্যে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, যা ইসরাইলের পক্ষ থেকে একটি অলঙ্ঘনীয় শর্ত। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বুধবার জানান, হামাস তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণাঙ্গভাবে রক্ষা করবে বলেই ওয়াশিংটন আশা করে। ট্রাম্প তার পোস্টে গাজার অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, ‘এই নেতারা একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।’

তিনি আরো জানান, মিসর, তুরস্ক ও কাতারের সহযোগিতায় হামাসের সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিশ্চিত করা হবে। এর মাধ্যমে সব অস্ত্র সমর্পণ এবং প্রতিটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করা হবে।

গাজা যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপেই অপূর্ণ অধিকাংশ লক্ষ্য

যুক্তরাষ্ট্র গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিলেও প্রথম ধাপ বাস্তবে খুব কম অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে বলে তথ্য উঠে এসেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতে গত ১০ অক্টোবর ২০২৫ থেকে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তার মূল লক্ষ্যগুলোর বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র জানায়, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে গাজার নিরস্ত্রীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গঠন এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেয়া হবে। এ নিয়ে আলোচনা করতে হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা বর্তমানে মিসরের রাজধানী কায়রোতে অবস্থান করছেন। তবে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।