এখনো ছেলের পায়ের শব্দ পান শহীদ বিপ্লবের মা

দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

Printed Edition
দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
দুই বছর পরও বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

ময়মনসিংহ অফিস

‘মা, মাগো... আমাকে নাস্তার টাকা দাও।’ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এই ডাক যেন এখনো কানে বাজে বিলকিস আক্তারের। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়, ছেলে বিপ্লব হাসান বুঝি ঘরের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হাঁটছে। হঠাৎ কোনো শব্দ হলেই তিনি চমকে ওঠেন। সেই দিনের গুলির শব্দ এখনও তাড়া করে ফেরে তাকে।

২০২৪ সালের ২০ জুলাই গৌরীপুরে গণ-অভ্যুত্থানের মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন এসএসসি পরীক্ষার্থী বিপ্লব হাসান। বাড়ির পাশেই তাকে দাফন করা হয়েছে। কিন্তু সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়েও শান্তি পান না তার মা-বাবা। এক দিকে সন্তানের শোক, অন্য দিকে বিচারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, দুই যন্ত্রণাই আজ তাদের নিত্যসঙ্গী।

শহীদ বিপ্লবের বাবা বাবুল মিয়া বলেন, ‘ছেলে দেশের জন্য জীবন দিলেও শান্তিপূর্ণভাবে জানাজাও করতে পারিনি। জানাজার পর প্রতিদিন পুলিশ বাড়িতে আসত। ভয়ে দিন-রাত বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে। তখন মনে হতো, সরকার না বদলালে হয়তো ছেলের আন্দোলনের কারণেই জীবনের বাকি সময় জেলেই কাটাতে হতো।’

তিনি জানান, তিন সন্তানের মধ্যে বিপ্লবই ছিল একমাত্র ছেলে এবং সবার বড়। হাজী মোজাফফর আলী ফকির উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল সে। ঘটনার দিন সকালে মায়ের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে নাস্তা খাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়। কিন্তু আর জীবিত ফিরে আসেনি।

বিলকিস আক্তারের কণ্ঠে এখনে সন্তানের শূন্যতার আর্তনাদ। তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে নেই। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? বিপ্লব তো সত্যিই বিপ্লব করেই চলে গেল। আমার বুক খালি করে দিল।’

পরিবারের অভিযোগ, কারফিউ উপেক্ষা করে মিছিলের অগ্রভাগে থাকা অবস্থায় বিপ্লবের মাথায় পুলিশের ছোড়া গুলিবিদ্ধ হয়। গুলি মাথার এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর, ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল বিপ্লবের বাবা বাবুল মিয়া বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয় গৌরীপুর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল আলমকে এবং দ্বিতীয় আসামি করা হয় তৎকালীন ওসি সুমন চন্দ্র রায়কে।

মামলায় আরো কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তবে মামলা দায়েরের পর ঘটনার দুই বছর অতিবাহিত হলেও প্রধান দুই আসামি এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবার।

বাবুল মিয়া বলেন, ‘যারা আমার ছেলের মাথা ঝাঁজরা করে দিল, তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: ফারুক হোসেন বলেন, মামলা এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। তবে শুনেছি অপরাধ ট্রাইবুনাল নাকি এক চার্জশিট দিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

দুই বছর পরও চুড়ালি গ্রামের সেই বাড়িতে শোকের আবহ কাটেনি। দেয়ালে টাঙানো বিপ্লবের ছবির দিকে তাকিয়ে মা এখনো অপেক্ষা করেন, হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে ছেলে, বলবে, ‘মা, আমি এসেছি।’ কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। স্মৃতি আছে, অশ্রু আছে, আছে বিচারের অপেক্ষা, ফিরে আসার আর কোনো পথ নেই।