বাংলাদেশ চায় ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে

বিবিসির বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভারত ও বাংলাদেশের মিডিয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে ভারত কেন বাংলাদেশের তারেক রহমানকে দিল্লিতে চায়? বাংলাদেশ তার নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্ক বিস্তারের সুযোগ দেখছে। তবে ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে দুই প্রতিবেশীকেই একসাথে পথ চলতে হবে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বা আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর দুই দেশের শীতল সম্পর্ক বরফ গলাতে এবং নতুন সমীকরণে একটি কার্যকর সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। এরপর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ভূমিধস জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। বাংলাদেশের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ঢাকা বারবার অনুরোধ জানালেও ভারত বিষয়টি কেবল ‘বিবেচনাধীন’ রেখেছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়া এবং ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ভারতের মাটিতে তাকে এ ধরনের সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা এবং স্থানীয় জনগণের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে অবনতি ঘটেছিল, তা পুনরুদ্ধার করতে চায় ভারত। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর যোগাযোগ ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে হাসিনার আমলে উভয় দেশই বিদ্রোহী দমন ও ট্রানজিট সুবিধার ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ অংশীদার ছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ তাদের ঐতিহ্যগত নীতি থেকে সরে এসে পাকিস্তানের সাথে উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে শুরু করেছে। এ ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রস্তাবিত ‘মক্কা চুক্তি’ ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বাংলাদেশের আগ্রহ ভারতের কৌশলগত উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বাস্তবতায় পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতেও বাংলাদেশকে নিজেদের কাছে রাখা দিল্লির জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে দেশের দীর্ঘদিনের নেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই নির্বাচন বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করে। ওই অভ্যুত্থানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছিল। তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং তখন থেকেই সেখানেই রয়েছেন। এখন, দিল্লি আশা করছে যে তারেক রহমানের সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের সুযোগ দেবে- কিন্তু ভারতীয় মাটিতে হাসিনার উপস্থিতি সেই কাজটিকে আরো কঠিন করে তুলছে।

অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়ার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ ভারতকে অনুরোধ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেস সেক্রেটারি এ এ এম সালেহ বলেন, আমরা একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় আছি।

ভারত জানিয়েছে, অনুরোধটি বিবেচনা করা হচ্ছে।

ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, আমি মনে করি [দিল্লিতে] কিছুটা হতাশা রয়েছে, কারণ হাসিনাকে হস্তান্তর করা ছাড়া ঢাকার সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা বেশ খানিকটা এগিয়েছে। বাণিজ্য সহজ করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে।

অবশ্যই, উভয় দেশের জন্যই অনেক কিছু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪,০৯৬ কিলোমিটার (২,৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, পাশাপাশি তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কও বিদ্যমান। গত বছর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যার বেশির ভাগই ছিল ভারতের অনুকূলে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে প্রবেশাধিকার উন্নত করার প্রচেষ্টাতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।

হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে, দুই সরকার সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণ করে, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রবেশাধিকার উন্নত করে। তারা নিরাপত্তার বিষয়েও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে; হাসিনার সরকার সেইসব বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাদের সম্পর্কে ভারত বলেছিল যে তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল।

কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলাদেশে ক্রমে বিতর্কিত হয়ে ওঠে, যেখানে সমালোচকরা দিল্লিকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগ উপেক্ষা করার জন্য অভিযুক্ত করেন এবং ভারতে তার অব্যাহত উপস্থিতি সেই উত্তেজনাকে জিইয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ বলেছে, ভারতীয় মাটিতে তাকে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি দেয়ায় তারা ‘ক্ষুব্ধ’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্য আসলে বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আন্তরিক কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। তাই হাসিনা দিল্লিতে থাকাকালীন তারেক রহমানের দিল্লি সফর দেশে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

কিন্তু সম্পর্ক মেরামতের জন্য ভারতের এই আগ্রহ শুধু হাসিনাকে নিয়েই নয়। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে বাংলাদেশ ভারতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সাথেও সম্পর্ক পুনর্গঠন শুরু করেছে। ঢাকা ও ইসলামাবাদ উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর বিনিময় করেছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছে। সম্প্রতি ঘোষিত মক্কা চুক্তি তিনটি শক্তিশালী ইসলামী দেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে এই মাসে স্বাক্ষরিত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের আগ্রহ জাগিয়েছে। সৌদি আরবও তারেক রহমানকে একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানের জন্য বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়।