মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ফের খুলল নেপথ্যে পুরনো সিন্ডিকেটের ছায়া?

মনির হোসেন
Printed Edition
  • ২৫ এজেন্সির তালিকা ঘিরে অভিযোগ- একেক নামের জন্য ৫ মিলিয়ন রিংগিট লেনদেনের দাবি
  • পরে ৩১২ এজেন্সি যুক্ত, কিন্তু তাদের ভূমিকা কী- সাবএজেন্ট, না সমান অংশীদার?
  • আগেরবার ৩০ হাজার কর্মী প্রতারিত; এবারো অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের শঙ্কা
  • ২৫ এজেন্সির ফর্মুলা নিয়ে বায়রা সদস্যদের ক্ষোভ, তদন্ত ও স্বচ্ছতা দাবি

দীর্ঘদিনের জটিলতা ও সিন্ডিকেট বিতর্কের পর আবারো খুলছে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। কূটনৈতিক তৎপরতায় বন্ধ দরজা খোলার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার আগেই নতুন করে সামনে এসেছে পুরনো সিন্ডিকেটের ছায়া। ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামের তালিকা প্রকাশ, পরে আরো ৩১২টি এজেন্সিকে যুক্ত করা এবং এসব এজেন্সির ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া অস্পষ্টতা ঘিরে রিক্রুটিং খাতে দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মালয়েশিয়ার বেস্টিনেটের কর্ণধার দাতো শ্রী আমিন নুরের নিয়ন্ত্রণাধীন এফডব্লিউসিএমএসে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে। বায়রার সাবেক এক নেতা দাবি করেছেন, প্রতিটি এজেন্সির নাম অন্তর্ভুক্ত করতে ১৭ কোটি টাকা পর্যন্ত দেয়ার কথা তিনি জানতে পেরেছেন। তবে এই অর্থ লেনদেনের প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট খাতের আরেকটি সূত্রের অভিযোগ, পুরনো সিন্ডিকেটের আদলে এবারো ‘কেন্দ্রীয়’ কয়েকটি এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। পরে শত শত এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট’ বা সহযোগী হিসেবে যুক্ত করে কাঠামোটিকে বড় করা হয়েছে।

এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে- শ্রমবাজার কি সত্যিই সবার জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে, নাকি পুরনো সিন্ডিকেট কাঠামোকেই নতুন নামে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে?

২৫ থেকে ৩৩৮ পরিবর্তন কেন?

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর জন্য সর্বশেষ দাতো শ্রী আমিন নুরের বেস্টিনেট কোম্পানির এফডব্লিউসিএমএসের ওয়েবসাইটে প্রথমে ২৫টি বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়। এসব এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে অনুমোদিত বা মনোনীত তালিকার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তালিকা প্রকাশের পরই রিক্রুটিং খাতে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। সাধারণ সদস্যদের বড় অংশ প্রশ্ন তোলে-৩ হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২৫টি এজেন্সি কেন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পাবে?

এরপর গত বৃহস্পতিবার সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলের নাম যুক্ত করে ২৬টি এজেন্সির সাথে আরো ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করা হয়। শুক্রবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই তালিকা অনুমোদন করে। এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

প্রথমে নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির প্রত্যেকটির সাথে আরো ১০টি করে মোট ২৫০টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বাকি ৬২টি এজেন্সিকে বোয়েসেলের সহযোগী হিসেবে রাখা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে।

অর্থাৎ প্রথমে ২৫, পরে ২৬, এরপর আরো ৩১২-তালিকা ও কাঠামোর এই পরিবর্তন কেন হলো, এর নীতিগত ভিত্তি কী এবং ৩১২টি এজেন্সির বাস্তব ক্ষমতা কতটুকু- এখনো তা নিয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই।

এজেন্সি মালিক হয়েও সাব-এজেন্ট কেন?

এখানেই ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি। রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের প্রশ্ন- যেসব ৩১২টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে, তারাও কিন্তু সরকারের নির্ধারিত নিয়ম মেনে লাইসেন্স নিয়েছেন এবং সরকারের কোষাগারে জামানত দিয়েছেন। তাহলে তাদের কেন অন্য একটি এজেন্সির অধীনে কাজ করতে হবে?

তাদের ভাষ্য, একটি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি যদি নিজেই কর্মী পাঠানোর আইনগত সক্ষমতা রাখে, তাহলে তাকে কেন অন্য একটি এজেন্সির ‘সাব-এজেন্ট’ বা সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে-এ প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে।

বিশেষ করে ২৫টি এজেন্সির হাতে যদি মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং বাকি এজেন্সিগুলো তাদের মাধ্যমে কাজ করে, তাহলে সেটি কার্যত সিন্ডিকেট কাঠামোর বাইরে কতটা-সেই প্রশ্নও উঠছে।

এক লাইসেন্সে ৫ কোটি পুরনো ফর্মুলা

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আকবর হোসেন মঞ্জু অভিযোগ করেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দাতো আমিন নুর ও রুহুল আমিন স্বপনের নেতৃত্বে যে সিন্ডিকেট কাঠামো গড়ে উঠেছিল, এবারো তার অনুরূপ একটি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।

নয়া দিগন্তকে তিনি বলেন, ‘আমি যতটুকু খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময়ে যেভাবে দাতো আমিন নুর ও রুহুল আমিন স্বপনের নেতৃত্বে ১০ জনের সিন্ডিকেট গড়তে বড় ধরনের ফান্ড- এক লাইসেন্সে ৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল, এবারো সেই একই ফর্মুলায় তারা ২৫ ‘অথরাইজড’ রিক্রুটিং এজেন্সির নামের তালিকা তৈরি করে এফডব্লিউসিএমএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করিয়েছে।’

তার দাবি, এসব এজেন্সির কয়েকটিকে তারা ঠিকভাবে চেনেন না। এর মধ্যে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের বিরুদ্ধে নারী পাচারে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দুদকে মামলা রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

আরো বিস্ফোরক দাবি করে আকবর হোসেন মঞ্জু বলেন, প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম ওয়েবসাইটে অন্তর্ভুক্ত করাতে আমিন নুরকে ১৭ কোটি টাকা করে দিতে হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

নেপথ্যে এমপিদের ভূমিকার অভিযোগ

সিন্ডিকেট গঠনের সাথে সরকারের অন্তত তিনজন বর্তমান এমপি নেপথ্যে রয়েছেন বলেও দাবি করেছেন আকবর হোসেন মঞ্জু। তিনি বলেন, শুনেছি, এই কার্যক্রমের সাথে সরকারের অন্তত তিনজন রানিং এমপি নেপথ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে একজন এমপি তার বনানীর হোটেলে একদিন এসেছিলেন। ওই এমপি সিন্ডিকেটের সাথে জড়ানোর কারণে তিনি ক্ষোভে তার সাথে কথা পর্যন্ত বলেননি।

তবে কোন এমপি এবং কী ধরনের ভূমিকা পালন করেছেন, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো নাম বা নথি দেননি।

এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কারণ শ্রমবাজার পরিচালনার মতো স্পর্শকাতর একটি খাতে রাজনৈতিক প্রভাব বা সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সেটি শুধু রিক্রুটিং ব্যবসার প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের স্বচ্ছতার সাথেও সরাসরি সম্পর্কিত।

শ্রমিক যাবে, টাকা যাবে অন্য পথে

সিন্ডিকেট নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শ্রমিকের খরচ ঘিরে। সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক ও অভিবাসন খাতের ব্যক্তিদের আশঙ্কা, ভিসা ট্রেডিং, প্রসেসিং, ডিমান্ড লেটার, সার্ভিস চার্জসহ বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হলে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা পড়বে কর্মীর ওপর।

অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকের কাছ থেকে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ আন্ডারহ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাচার হতে পারে। এমনকি হুন্ডির মাধ্যমে টাকা সিন্ডিকেটের কাছে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এসব অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা এই আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগও দিচ্ছে না।

কারণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ৩০ হাজার কর্মপ্রত্যাশী টাকা দিয়ে ভিসা ও টিকিট কিনেও প্রতারিত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকে জমি বিক্রি, ঋণ কিংবা সঞ্চয়ের টাকা খরচ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাদের বড় অংশ অনিশ্চয়তায় পড়ে।

এবার একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বড় হতে পারে।

আমরা চাই শ্রমবাজার খুলুক, সিন্ডিকেট নয়

আকবর হোসেন মঞ্জু বলেন, আমরা চাই শ্রমবাজার খুলুক। সবাই কাজ করুক। শ্রমিক বেশি করে যাক। কিন্তু আবারো দাতো আমিন নুর আর রুহুল আমিন স্বপনের ফর্মুলায় শ্রমিক যাবে- এটা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এটা তো ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমল নয়। এটা হলো গণতান্ত্রিক সরকার।

তার ভাষ্য, আগের ফর্মুলায় কর্মী গেলে বাংলাদেশ থেকে শ্রমবাজার খোলার আগেই বিপুল পরিমাণ টাকা দেশ থেকে পাচার হয়ে যাবে। এমনিতেই আমাদের দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ব্যাংকে টাকা নেই। নানা সঙ্কটের মধ্যে আছি আমরা।

তিনি অভিযোগ করেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তার ভাষায়, আমরা যারা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি, তাদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাদের আমরা বলে দিয়েছি, এবার আমরা আর কাউকে ভয় পাবো না। যতক্ষণ সিন্ডিকেট না ভাঙবে, ততক্ষণ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলেই যাবো।

৩ হাজার এজেন্সির মধ্যে ২৫ কেন?

বাংলাদেশে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এসব এজেন্সি সরকারের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে। তাহলে প্রশ্ন হলো- মালয়েশিয়ার মতো একটি বড় শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কেন প্রথমে মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে রাখা হলো?

যদি মালয়েশিয়ার সরকারের সাথে সমঝোতা স্মারকের কারণে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, তাহলে এর আইনগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী? আর যদি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে বাকি বৈধ এজেন্সিগুলোকে কেন সরাসরি কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেয়া হচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার না হলে ৩১২টি এজেন্সিকে পরবর্তীতে যুক্ত করার সিদ্ধান্তও সন্দেহমুক্ত হবে না।

বায়রার সাধারণ সদস্যদের ক্ষোভ

গত ৩০ আগস্ট বায়রার সাধারণ সদস্যদের নাম ও স্বাক্ষরসংবলিত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্তের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও ‘২৫ এজেন্সি নির্ভর সিন্ডিকেট’ গ্রহণযোগ্য নয়। সব বৈধ এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেয়ার দাবি জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন রিয়াজুল ইসলাম, নুরুল আমিন, ফখরুল ইসলাম, আকবর হোসেন মঞ্জু, মফিজ উদ্দিন, কাজী এম এ কাসেম, বীর মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আলতাব খান, জাহাঙ্গীর আলম, কামাল উদ্দিন দিলু, মোহাম্মদ আলী, ড. আশাদুজ্জামান, হক জহিরুল জুয়েল, ফজলুল মতিন তৌহিদ, এ কে আজাদ, মোশাররাফ হোসেন, আলহাজ আব্দুল মতিন, জহিরুল ইসলাম, আব্দুল ফজল বাচ্চু ও আব্দুর রউফ।

তারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে নিজস্ব ডিমান্ডের বিপরীতে সরাসরি কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিতে হবে। তাদের বক্তব্য, বর্তমানে সমঝোতা স্মারকের কারণে যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বোয়েসেলের মাধ্যমে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেয়া যেতে পারে।

এবার নজরদারি না হলে দায় কার?

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান। মালয়েশিয়া তাদের অন্যতম কাক্সিক্ষত গন্তব্য।

কিন্তু এই বাজারকে কেন্দ্র করে অতীতে যে ধরনের অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সিন্ডিকেট, ভিসা বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে, এবার তার পুনরাবৃত্তি হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ কর্মীরা। তাই শ্রমবাজার পুরোপুরি চালুর আগেই কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।

প্রথমত, ২৫টি এজেন্সি কিভাবে নির্বাচিত হলো- তার পূর্ণ প্রক্রিয়া প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসব এজেন্সির সাথে ২৫০টি ‘অ্যাসোসিয়েট’ এজেন্সির সম্পর্কের আইনগত ভিত্তি কী, তা স্পষ্ট করতে হবে। তৃতীয়ত, ৬২টি এজেন্সিকে বোয়েসেলের সহযোগী হিসেবে যুক্ত করার প্রক্রিয়া ও শর্ত প্রকাশ করা প্রয়োজন। চতুর্থত, একজন কর্মীর মালয়েশিয়া যাওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ হবে, তা সরকারিভাবে নির্ধারণ ও প্রকাশ করতে হবে। পঞ্চমত, ভিসা, ডিমান্ড লেটার, প্রসেসিং ও সার্ভিস চার্জের প্রতিটি স্তরে অর্থ লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে বাধ্যতামূলক করা দরকার। ষষ্ঠত, কোনো এজেন্সি নির্ধারিত খরচের অতিরিক্ত অর্থ নিলে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সপ্তমত, অতীতে শ্রমিক প্রতারণা বা মানবপাচারের অভিযোগ থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকলে তা তদন্ত করতে হবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সীমিতসংখ্যক এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে যেতে দেয়া যাবে না।

সামনে বড় পরীক্ষা

সরকার বলছে, এবার কোনো সিন্ডিকেট হতে দেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষা হবে তালিকা ও কার্যক্রমের কাঠামোতে। যদি ২৫টি এজেন্সি কেবল প্রশাসনিকভাবে একটি সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করে এবং ৩১২টি এজেন্সিসহ সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি স্বচ্ছ নিয়মে কর্মী পাঠাতে পারে, তাহলে সিন্ডিকেটের অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল হবে।

কিন্তু যদি ২৫টি এজেন্সি ভিসা, ডিমান্ড ও কর্মী পাঠানোর মূল নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং অন্য এজেন্সিগুলো তাদের কাছ থেকে অনুমতি বা কর্মী সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে নাম পরিবর্তন হলেও কাঠামোগতভাবে পুরনো সিন্ডিকেটের প্রশ্ন থেকেই যাবে।

এ কারণেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে অর্থের প্রবাহের দিকে। একজন কর্মপ্রত্যাশী বাংলাদেশ থেকে টাকা দেয়ার পর সেই টাকা কোন কোন স্তরে যাচ্ছে, কে কত কমিশন পাচ্ছে, ভিসা বা ডিমান্ডের জন্য কোনো অতিরিক্ত অর্থ নেয়া হচ্ছে কি না- এসব তথ্যই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে শ্রমবাজারটি কতটা স্বচ্ছ।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, বোয়েসেল এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এখনই সমন্বিত নজরদারি শুরু করা প্রয়োজন। কারণ শ্রমবাজার খোলার পর ব্যবস্থা নেয়া মানে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া। কর্মী বিদেশে যাওয়ার আগে যদি অনিয়ম শনাক্ত করা যায়, তবেই হাজার হাজার কর্মপ্রত্যাশীকে সম্ভাব্য প্রতারণা থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলছে- এটি আনন্দের খবর। কিন্তু প্রশ্ন হলো- বাজারটি কি এবার কর্মীর জন্য খুলছে, নাকি মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের জন্য? ২৫টি এজেন্সির তালিকা থেকে ৩১২টি এজেন্সির সংযোজন- এই পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং অর্থ লেনদেনের জবাবদিহিই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শ্রমবাজার খুললেই হবে না; এবার নিশ্চিত করতে হবে- বাংলাদেশী কর্মীর ঘাম যেন কারও সিন্ডিকেটের মুনাফায় পরিণত না হয়।