বিশেষ সংবাদদাতা
জামায়াতে ইসলামী দেশে-বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান অর্থনৈতিক সুশাসন ও দরিদ্রবান্ধব ব্যবস্থা দিয়ে দেশের সব মানুষের জন্য শান্তি ও স্বস্তির জীবন ফিরিয়ে আনতে চায়। এ বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে পলিসি সামিট ২০২৬ এ বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। দলটির ঘোষিত নীতিগুলোতে বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট, আস্থাহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় সংস্কারমুখী ও শাসনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়।
সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড চালু : সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তি নীতির আওতায় ‘সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’ চালুর প্রস্তাব রয়েছে, যা মা, শিশু, যুবক, কৃষক ও দুস্থ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনবে। পাশাপাশি নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক খাতে শূন্য বৈষম্যের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে, নীতি শীর্ষ সম্মেলন ২০২৬-এ উপস্থাপিত জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত প্রস্তাবনায় অর্থনৈতিক শাসন, স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে একীভূত কাঠামোয় দেখার চেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে। বাস্তবায়নের সমতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে এই নীতির সামঞ্জস্য কতটা হয়, সেটিই এখন মূল আলোচ্য বিষয়।
চাকরি ও যুব সুযোগ : কর্মসংস্থানমুখী মানবসম্পদ গঠন
যুবসমাজকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপ দিতে চাকরি ও যুব সুযোগ শীর্ষক নীতিতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এই নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষায় অর্থনৈতিক সহায়তা এবং দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
নীতির আওতায় দক্ষতা পুনর্নির্মাণ বৃত্তি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে ১৩ লাখ বেকার গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত মাসিক ১০ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে। এই সহায়তা প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও সক্রিয়ভাবে চাকরি অনুসন্ধানের শর্তসাপেক্ষে প্রদান করা হবে। লক্ষ্য হলো শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা পুনর্গঠন করে তরুণদের কর্মসংস্থানে দ্রুত যুক্ত করা।
মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে ১ লাখ শিক্ষার্থীকে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই ঋণ দেশের ভেতরে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, যাতে আর্থিক সীমাবদ্ধতা মেধা বিকাশের পথে বাধা না হয়।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যয় কমাতে সার্বজনীন শিক্ষার্থী ভাতা হিসেবে মাসিক তিন হাজার টাকা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আরো মনোযোগী হতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষাখাতে জনবল সঙ্কট নিরসনে খালি শিক্ষক পদে তাৎক্ষণিক নিয়োগ দেয়ার কথাও নীতিতে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে একদিকে শিক্ষার মান উন্নত হবে, অন্য দিকে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সার্বিকভাবে, এই কর্মসূচিগুলো যুবসমাজকে দক্ষ আত্মনির্ভরশীল ও কর্মমুখী করে তুলতে একটি কাঠামোগত ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত।
জামায়াতে ইসলামীর নীতিতে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। ৬০ বছরের ঊর্ধ্ব নাগরিক ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং আগামী পাঁচ বছরে ৬৪টি বিশেষায়িত জেলা হাসপাতাল নির্মাণে এক লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নে অবকাঠামো ও শিল্প ত্রাণ খাতে সড়ক ও মহাসড়ক উন্নয়নে আরো এক লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা রয়েছে, যাতে পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় কমে। শিল্পখাতে স্বস্তি দিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির ট্যারিফ বৃদ্ধি তিন বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
ভালো অর্থনৈতিক শাসন : রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা
জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাবিত নীতির অন্যতম মূল স্তম্ভ হলো নিয়মভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে আইন ও নীতির ভিত্তিতে- রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দলীয় হস্তক্ষেপ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো সুযোগ থাকবে না। এতে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান মাঠ নিশ্চিত হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমনে দলটি দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা এবং জোরদারের অঙ্গীকার করেছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করা, বুরোক্র্যাটিক জটিলতা কমানো এবং প্রক্রিয়াগত সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতিকে অর্থনৈতিক অদক্ষতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার সংস্কার : ব্যাংকিং খাত সংস্কার জামায়াতের অর্থনৈতিক এজেন্ডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর্থিক খাত সংস্কারের আওতায় পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে ঋণখেলাপি সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে ঋণ পুনরুদ্ধার জোরদার করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা বাড়ানো এবং পোর্টফোলিওর মান উন্নয়নের মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তি মজবুত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দলটি মনে করে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজনৈতিক চাপমুক্ত না হলে টেকসই আর্থিক শাসন সম্ভব নয়।
পুঁজিবাজার নিয়ে ঘোষণায় বলা হয়েছে, পুঁজিবাজার সংস্কারের মাধ্যমে শেয়ারবাজার পুনর্গঠন করা হবে এবং অতীতে বাজার ধসের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই এ সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত সংস্কারের মাধ্যমে লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক উদ্যোগে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কমে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
ডিজিটাল লেনদেন ও ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা : ডিজিটাল অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেশব্যাপী ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম সম্প্রসারণের মাধ্যমে নগদ লেনদেন নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে কর ফাঁকি কমবে এবং আর্থিক লেনদেন আরো ট্র্যাকযোগ্য হবে বলে দাবি করা হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে জামায়াতে ইসলামী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর সংস্কার ও ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বৈধ চ্যানেলে আনতে প্রণোদনা জোরদারের প্রস্তাব রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, ঋণ ব্যবস্থাপনার সমতা বাড়ানো এবং রফতানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতির বাহ্যিক চাপ মোকাবিলার রূপরেখাও নীতিতে অন্তর্ভুক্ত। সরকারি অর্থব্যয়ে অপচয় ও দুর্নীতি কমিয়ে স্বচ্ছ, প্রমাণভিত্তিক সরকারি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী অর্থনীতি ও সামাজিক অর্থায়নকে বিকল্প আর্থিক কাঠামো হিসেবে এগিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে।



