রাশিয়া থেকে সার আমদানি চুক্তি বাতিল হচ্ছে!

পিজি জমা দিতে ব্যর্থ থার্ড পার্টি

Printed Edition

কাওসার আজম

রাশিয়া থেকে দুবাইভিত্তিক তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান ডেলটা স্টার ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এক লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানির সরকারি উদ্যোগ নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) জমা দিতে না পারায় প্রথম চালানের ৪০ হাজার টনের চুক্তি বাতিলের পথে রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় উচ্চমূল্যে সার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিসিআইসি এখন সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে কম দামে সার আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল সঙ্ঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদন, পরিবহন ও লজিস্টিক অনিশ্চয়তার অজুহাতে গত ১৭ জুন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান পিজেএসসি আরকনের সার দুবাইভিত্তিক ডেলটা স্টার ট্রেডিং এফজেড-এলএলসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেয়। অনুমোদন অনুযায়ী এক লাখ টন ইউরিয়ার মধ্যে প্রথম ধাপে ৪০ হাজার টন এবং পরে ধাপে ধাপে অবশিষ্ট ৬০ হাজার টন আমদানি হওয়ার কথা ছিল।

তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেলটা স্টার পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দিতে না পারায় পুরো প্রক্রিয়া এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান নয়া দিগন্তকে গতকাল সন্ধায় বলেন, ‘আমাদের কাছে ওদের (ডেল্টা স্টার) পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পিজি জমা দিতে পারেনি। এ কারণে প্রথম লট নিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। এটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’

২-১ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর আগেও দু’টি প্রস্তাব বাতিল হয়েছে। তখন দাম বেশি ছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম আরো কমে গেছে। আমরা কম দামে সার কেনার চেষ্টা করছি।’

রাশিয়া থেকেই সার সংগ্রহ করা হবে কি না এবং সেটা জিটুজি পদ্ধতিতে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে বিসিআইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতেই যাওয়ার চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে আমরা এগোচ্ছি।

প্রথম ৪০ হাজার টনের চালান বাতিল হলেও বাকি ৬০ হাজার টনের কী হবে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রথম চালানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা বসে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।’

সরকারি নথি অনুযায়ী, ডেলটা স্টারের প্রস্তাবে প্রতি মেট্রিক টন ইউরিয়ার মোট মূল্য ধরা হয়েছে ৭০৭ দশমিক ০১ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এফওবি (ফ্রি অন বোর্ড) মূল্য ৬০০ দশমিক ৮৩ ডলার, জাহাজ ভাড়া ৭৫ ডলার এবং ব্যাগিং ও স্থানীয় পরিবহন ব্যয় ৩১ দশমিক ১৮ ডলার।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১১ জুন প্রকাশিত আইসিআইএস, আর্গাস নাইট্রোজেন ও ফারটেকনের মূল্য সূচক অনুযায়ী ১০ ডলার ডিসকাউন্ট সমন্বয়ের পর কার্যকর এফওবি মূল্য ছিল ৪৪৪ দশমিক ১৭ ডলার। মাত্র এক সপ্তাহ পর, ১৮ জুন, একই সূচকে মূল্য আরো কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪১০ ডলারে। বর্তমানে এই দাম আরো নিম্নমুখী বলে জানা যায়।

সূত্র জানায়, ডেলটা স্টারের প্রস্তাবিত এফওবি মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১৫৭ থেকে প্রায় ১৯১ ডলার পর্যন্ত বেশি। এক লাখ টন ইউরিয়া আমদানিতে এই অতিরিক্ত মূল্য সরকারের প্রায় ১৯২ কোটি থেকে ২৩৪ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়। এরপরও প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি দামে থার্ড পার্টির মাধ্যমে রাশিয়া থেকে সার কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এক্ষেত্রে বিসিআইসির একটি চক্র জড়িত বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

সার খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের বিদ্যমান জি-টু-জি অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফার্টিগ্লোব এবং সৌদি আরবের সাবিকের মূল্যসূত্র অনুযায়ী একই সময়ে আরো কম দামে ইউরিয়া সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল। শুধু তাই নয়, রাশিয়ার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘমেয়াদি জি-টু-জি কাঠামোর আওতায় প্রতি টনে আরো ১০ ডলার কম মূল্যে সার সরবরাহের আগ্রহ দেখিয়েছিল। এ ছাড়া আজারবাইজান, উজবেকিস্তানসহ একাধিক উৎস থেকেও তুলনামূলক কম মূল্যের প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাশিয়া সরকারও দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সরাসরি সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে ইউরিয়া সরবরাহের আগ্রহ জানিয়েছিল। এমনকি এ ধরনের সহযোগিতার একটি কাঠামোও বিদ্যমান রয়েছে। এরপরও একই উৎস থেকে তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করে সার আমদানির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বেশি দিয়ে সার আমদানির সিদ্ধান্ত হলেও থার্ড পার্টি এই সার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তবে, বার বার সার আমদানির প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ায় আগামী আমন মৌসুম হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।