জাতীয় শ্রমিক শক্তির সভায় বক্তারা

বাজেট শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ ও জনস্বার্থবিরোধী বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তি। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, শ্রমিকবান্ধব বাজেট প্রণয়ন এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

গতকাল বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আয়োজিত ‘২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শ্রমিকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন।

জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকিরের সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব ঋয়াজ মোর্শেদের সঞ্চালনায় সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিলসের নির্বাহী পরিচালক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আখতার চৌধুরী, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এ এম ফয়েজ হোসেন, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক জোটের সাধারণ সম্পাদক বাদল খান এবং এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। সেমিনারে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট গত অর্থবছরের তুলনায় কমানো হয়েছে, যা দেশের বিশাল শ্রমশক্তির উন্নয়ন ও কল্যাণের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আখতার চৌধুরী বলেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমিক কল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও বিদেশগামী শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাসে বাজেটে কোনো কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমাগত বাড়লেও তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।

সদস্যসচিব ঋয়াজ মোর্শেদ অভিযোগ করেন, জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় শ্রমিক প্রতিনিধি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে কোনো অর্থবহ পরামর্শ বা সংলাপ হয়নি। ফলে শ্রমিক শ্রেণীর বাস্তব চাহিদা বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন, শিক্ষার সুযোগ, পেনশন ব্যবস্থা ও বেকারত্বকালীন সহায়তার মতো মৌলিক বিষয় দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। বক্তারা ভবিষ্যৎ বাজেট প্রণয়নের আগে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা করে তাদের প্রস্তাবনার ভিত্তিতে শ্রমিকবান্ধব বাজেট প্রণয়নের দাবি জানান।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বাজেটকে ‘হাওয়াই মিঠাইয়ের’ সাথে তুলনা করে বলেন, এই বাজেটে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। তিনি বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

সেমিনার থেকে জাতীয় শ্রমিক শক্তি কয়েকটি দাবি উত্থাপন করে। এর মধ্যে রয়েছে- শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে জাতীয় তহবিল গঠন ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ, নি¤œ আয়ের শ্রমজীবীদের জন্য রাষ্ট্রীয় রেশনিং ব্যবস্থা চালু, শিল্পাঞ্চলে আধুনিক ও বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প গ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, পেনশন, স্বাস্থ্যবীমা ও বেকারত্বকালীন সহায়তা চালু। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীন কার্যক্রম নিশ্চিত করা, শ্রম আইন বাস্তবায়ন ও শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার দাবিও জানানো হয়।

সমাপনী বক্তব্যে জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম ফকির বলেন, জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি রাষ্ট্রের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। কিন্তু বর্তমান বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় প্রতিফলন দেখা যায়নি। তিনি বলেন, দেশের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল শক্তি শ্রমজীবী মানুষ। তাদের স্বার্থ, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত না করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।