গোল্ডেন বুটের লড়াই-ই আর্কষণ তৃতীয় স্থানের ম্যাচে

Printed Edition
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আর্জেন্টিনার মেসি এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে  :  ইন্টারনেট
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে আর্জেন্টিনার মেসি এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক যুক্তরাষ্ট্র থেকে

‘ইংল্যান্ড বা ফ্রান্স কোনো দলের খেলোয়াড়ই এই ম্যাচটি খেলতে চায় না। তারা ফাইনালে খেলতে চেয়েছিল। ফাইনালে ওঠার জন্য আমরা সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছি। সবাই বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই খেলে; কিন্তু বাস্তবতা এখন এটাই।’ ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেলের এই বক্তব্যই বলে দিচ্ছে কতটা ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হয় সেমিতে হারা দলগুলোকে। ফাইনালে যেতে না পারার কষ্ট এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লাঘবের কোনো সুযোগ নেই। এর পরও ফিফার বেঁধে দেয়া নিয়ম। তাই খেলতেই হয়। অবশ্য এই ম্যাচে জয়ী দল অর্থাৎ তৃতীয় স্থানাধিকারী দল চতুর্থ স্থানাধিকারী দলের তুলনায় পুরস্কার হিসেবে দুই মিলিয়ন ডলার বেশি পায়। অবশ্য এবারের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ এখন গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়ের জন্য বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যদিও কিলিয়ান এমবাপ্পে, হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহামদের কাক্সিক্ষত ৮টির বেশি গোল করে তাকিয়ে থাকতে হবে ফাইনালে লিওনেল মেসির দিকে। ৮ গোল দিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে মেসি ও এমবাপ্পে। ছয় গোল নিয়ে এরপরেই অবস্থান হ্যারি কেন ও বেলিংহামের।

ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম অবশ্য এই ম্যচটি নিয়েও খুব সিরিয়াস। সেরা তিনে থাকাটা অবশ্যই একটি অর্জন। সে সাথে জয়ে শেষ করা বিশ্বকাপ। তার মতে ‘এখন আমরা তৃতীয় হতে চাই। তাই এটি অর্জনে আমরা আমাদের সাধ্যমতো সবকিছু করব। আমরা এমন অবস্থানে নেই, যেখানে আমরা থাকতে চেয়েছিলাম বা আশা করেছিলাম। আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষার তুলনায় হতাশার মাত্রাও তেমনই। তবে আমাদের তা মেনে নিতেই হবে। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে হবে এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। প্রথম সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ফ্রান্স পরাজিত হয়। এরপর আর্জেন্টিনার কাছে ধারশায়ী ইংল্যান্ড। তাই এই দুই দেশ এখন তৃতীয় স্থানের জন্য লড়ছে।

এটা সত্য সেমিফাইনালে পরাজিত দলগুলোর অধিকাংশ খেলোয়াড় ও সমর্থকই কেবল বাড়ি ফিরে যেতে চান। তবে কোনো কোনো দলের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক। তারা বিশ্বকাপে আরো একটি ম্যাচ বেশি পাচ্ছে। কোচরাও তাদের রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়দের পরখ করেন এই ম্যাচে। সেই সাথে এই সাইড বেঞ্চের খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপে অন্তত একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ দেয়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী প্লে-অফ ম্যাচ একটি দলের জন্য প্রতীকী ব্রোঞ্জ পদক এবং পোডিয়ামে স্থান অর্জনের একটি সুযোগ এবং তাত্ত্বিকভাবে দু’টি শীর্ষ দলের মধ্যে একটি উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ।

এ ছাড়া এই একটি অতিরিক্ত ম্যাচ ফিফা এবং আয়োজক শহরের জন্য আরো বেশি রাজস্ব আয়ের একটি সুযোগ। সাথে এটি সম্প্রচারকারীদের শেষ সেমিফাইনাল ও ফাইনালের মধ্যবর্তী সময়সূচির শূন্যস্থান পূরণে সহায়তা করে।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে ছিল না এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। এটি প্রথম চালু হয়েছিল ১৯৩৪ সালের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে, যখন অস্ট্রিয়াকে ৩-২ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে জার্মানি। ১৯৩৮ সালেও এই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ১৯৫০ সালের আসরে এটি অনুষ্ঠিত হয়নি। এটি ১৯৫৪ সালে পুনরায় চালু করা হয় এবং তারপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই এটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

এবার এই ম্যাচ গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইকে প্রভাবিত করবে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের জাস্ট ফঁতেন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফ্রান্সের ৬-৩ গোলের জয়ে চারটি গোল করেন। যা তাকে এক বিশ্বকাপে একজন খেলোয়াড়ের রেকর্ড ১৩ গোল করার সুযোগ দিয়েছে। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ছয় গোল দিয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন বুলগেরিয়ার ওলেক সালেঙ্কো ও বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টইচকভ। নরওয়ের সাথে সেবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলেছিলেন স্টইচকভকে একটি গোল করতে দিয়ে তাকে সর্Ÿোচ্চ গোলদাতা বানাতে চেয়েছিলেন সুইডেনের গোলরক্ষক। কিন্তু হিস্টোইচকভ বুঝতে পারেননি সুইডিশ ভাষা। ফলে আর ট্রফি হিস্টোইচকভের পাওয়া হয়নি।

যদিও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি বর্তমানে আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন (গোলের সংখ্যা সমান হলে যা টাইব্রেকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়), ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের রয়েছে আটটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেন ও জুড বেলিংহাম উভয়েরই রয়েছে ছয়টি করে গোল।

এই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের রেকর্ড ইংল্যান্ডের পক্ষে কথা বলে না। তারা দুইবারই খেলে প্রতিবারই হেরেছে। অন্য দিকে ফ্রান্স তিনটি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী প্লে-অফের মধ্যে দু’টি জিতেছে ১৯৫৮ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জয় এবং ১৯৮৬ সালে অতিরিক্ত সময়ের পর বেলজিয়ামকে ৪-২ গোলে হারানো। ফ্রান্স ১৯৮২ সালে পোল্যান্ডের কাছে হেরেছিল। আসলে সেমিফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে শোচনীয় পরাজয়ের পর মিশেল প্লাতিনির মতো বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়েছিলেন ফ্রান্সের কোচ।

ইংল্যান্ড তাদের আগের দু’টি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী হেরেছিল। ১৯৯০ সালে স্বাগতিক ইতালির কাছে ২-১ গোলে এবং ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে ২-০ গোলে। জার্মানি বিশ্বকাপে চারবার তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে- যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।