নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরান ও মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বাহিনীর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ গতকাল সোমবার ৭৩তম দিনে পদার্পণ করেছে। দীর্ঘ আড়াই মাসের এই সঙ্ঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলে যে ক্ষীণ আশার আলো দেখা দিয়েছিল, তা চূড়ান্ত অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরানের পাঠানো সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দিকে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ‘অযৌক্তিক’ ও ‘একতরফা’ দাবি জানাচ্ছে বলে পাল্টা ইরানের দাবির মুখে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন আরো ঘনীভূত যুদ্ধের মেঘে ছেয়ে গেছে।
এক দিকে যখন কূটনীতির টেবিলে বাদানুবাদ চলছে, অন্য দিকে রণক্ষেত্রে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লাশের মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় লেবাননে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন দুইজন সেবাকর্মী। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে; বিশেষ করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শান্তি আলোচনার এই ব্যর্থতা এবং পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলার ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনির্দিষ্টকালের মহাযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
‘অগ্রহণযোগ্য’ প্রস্তাব ও ট্রাম্পের জেদ
যুদ্ধের ৭৩তম দিনে এসে শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান একটি ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব ওয়াশিংটনের কাছে পাঠিয়েছিল। তবে সোমবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোস্যালে’ এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দেন। ট্রাম্প লিখেছেন, “আমি ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আসা জবাব পড়েছি। আমার এটি পছন্দ হয়নি এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।” যদিও তিনি প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি, তবে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাবকে ইরানের ‘একতরফা দাবি’ হিসেবে দেখছে।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, সঙ্ঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে ইরানের প্রস্তাবগুলো ছিল অত্যন্ত বৈধ ও উদার। তিনি বলেন, “আমরা কোনো বাড়তি সুবিধা চাইনি। আমাদের দাবি ন্যায্য। আমরা যুদ্ধ বন্ধ, মার্কিন অবরোধ ও জলদস্যুতার অবসান এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখা ইরানি সম্পদের মুক্তি চেয়েছি।” বাঘাই আরো হুঁশিয়ারি দেন যে, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ইরানের লক্ষ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘ঔদ্ধত্যের’ কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।
তেলের বাজারে আগুন ও অর্থনীতির সঙ্কট
ট্রাম্পের অনড় অবস্থান এবং শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার খবরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোমবার এশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪.০১ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্য দিকে মার্কিন তেলের মানদণ্ড ডব্লিউটিআইর দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫.৫ ডলারে ঠেকেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ এই পথেই সরবরাহ হয়। বর্তমানে এই পথে কার্গো চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ৫০টির বেশি দেশ নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছেন, যাতে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-যোগাযোগ আবার সচল করা যায়। তবে ইরান এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ’ বলে সতর্ক করেছে।
লেবাননে লাশের মিছিল
রণক্ষেত্রে ইসরাইলি আগ্রাসন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ৫১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষিণ লেবাননের বেন্ত জবেইল জেলার কালাউইয়া ও তিবনিনে দু’টি চিকিৎসাকেন্দ্রে সরাসরি হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। এতে দু’জন চিকিৎসাকর্মী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অভিযানে এ পর্যন্ত লেবাননে দুই হাজার ৮৪৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
জাতিসঙ্ঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১০৩ জন চিকিৎসাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ গত ১৬ এপ্রিল ট্রাম্প নিজেই একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা বর্তমানে কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি বাহিনী নিয়মিত একে-অপরের বিরুদ্ধে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করছে। লেবানন সীমান্তের কাছে আলেকজান্ডার গ্লোভানিয়ভ নামে এক ইসরাইলি সেনাচালকও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ড্রোন আতঙ্ক ও গুপ্তচর মৃত্যুদণ্ড
যুদ্ধ এখন কেবল ইরান বা ইসরাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এতে জড়িয়ে পড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা দু’টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কাতার তাদের জলসীমায় একটি কার্গো জাহাজের ওপর ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অন্য দিকে কুয়েত তাদের আকাশসীমায় শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন প্রবেশের কথা স্বীকার করেছে।
এ দিকে যুদ্ধের আবহে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও কঠোর হচ্ছে। সোমবার সকালে তেহরান ঘোষণা করেছে যে, মার্কিন ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী এরফান শাকুরজাদেহ নামে এক বিজ্ঞানীর মৃতুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তিনি স্যাটেলাইট-সংক্রান্ত গোপন তথ্য বিদেশী সংস্থাকে পাচার করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিল।
বেইজিং সফর ও ইউর উদ্বেগ
সঙ্কট নিরসনে বিশ্বশক্তির দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রয়েছে। ব্রাসেলসে গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরান যুদ্ধ এবং ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছেন। তবে সবার নজর এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরের দিকে। আগামীকাল বুধবার ট্রাম্প বেইজিং সফরে যাচ্ছেন, যেখানে তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ইরান যুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করবেন। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মধ্যস্থতা ছাড়া এই যুদ্ধ থামানো এখন প্রায় অসম্ভব।
খাদের কিনারে মধ্যপ্রাচ্য
ইরান যুদ্ধের ৭৩তম দিন শেষে দেখা যাচ্ছে, কূটনীতি এখন বোমার আওয়াজের নিচে চাপা পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ‘ইগো’ বা জেদ মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ধ্বংসযজ্ঞের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেলের উচ্চমূল্য মার্কিন অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ট্রাম্পের চীন সফরের দিকে- সেখান থেকে কোনো কার্যকর সমাধান আসে কি না, সেটিই দেখার বিষয়। অন্যথায় ১০৫ ডলারের তেল আর লেবাননের ধ্বংসস্তূপ বিশ্বকে এক গভীর অর্থনৈতিক মন্দা ও মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে।



