আলী জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)
বর্ষা এলেই একসময় নিকলীর হাওর জেগে উঠত বৈঠার ছন্দে। রঙ-বেরঙের নৌকা ছুটত জলের বুক চিরে। শত শত বৈঠার ওঠানামায় সৃষ্টি হতো ঢেউ। মাঝিমাল্লার হুংকার, সারি গানের সুর আর দুই তীরে হাজারো দর্শকের উচ্ছ্বাসে হাওর পরিণত হতো উৎসবের মঞ্চে। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতি।
নিকলীতে এখনো হাওর আছে, নৌকা আছে, পর্যটকও আসেন। নেই শুধু নিয়মিত নৌকাবাইচের সেই জৌলুশ। গত ২০১৭ সালে সোয়াইজনী নদীতে ১০টি নৌকার অংশগ্রহণে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিপুল দর্শকের সমাগমও হয় তখন। পরে ঘোড়াউত্রা নদীতেও বাইচের আয়োজন করা হয়। কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, নৌকা বাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতাই নয়; এটি হাওরবাসীর লোকসংস্কৃতি, সামাজিক মিলন ও বিনোদনের অংশ। এর সাথে জড়িয়ে আছে মাঝিমাল্লার দক্ষতা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ, সারি-ভাটিয়ালি গান, স্থানীয় খাবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। ফলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি অংশ হারিয়ে যাবে।
নিকলী ইতোমধ্যে হাওরভিত্তিক পর্যটনের পরিচিত গন্তব্য হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে নৌভ্রমণ ও জল-প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। স্থানীয়দের মতে, নির্দিষ্ট সময়ে ‘নিকলী নৌকাবাইচ উৎসব’ আয়োজন করা গেলে পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। এতে মাঝি, নৌকার মালিক, খাবারের দোকানি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহনকর্মীদের আয়ও বাড়তে পারে।
তবে, নৌকাবাইচের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা। খাল-নদীতে পলি জমা, পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা এবং বিভিন্ন ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপে অনেক জলপথ সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে নিকলীর আড়িবিল খাল পুনঃখনন কর্মসূচি শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল নদী-বিলের সংযোগ ফিরিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা। স্থানীয়ভাবে শতবর্ষী খালটি ভরাট ও পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, অর্থনৈতিক কারণে আগের মতো নৌকা তৈরির উদ্যোগও নেই। তবে অতীতের ঐতিহ্য হাওরবাসীর মধ্যে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তি বলেন, স্থানীয়ভাবে ঐতিহ্যটি ধরে রাখার উদ্যোগ নেয়া হলে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এ ব্যাপারে স্থানীয় পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নির্দিষ্ট জলপথ নির্বাচন, নাব্যতা যাচাই, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে আয়োজনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা প্রয়োজন। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ক্রীড়া সংগঠনকে নিয়ে স্থায়ী আয়োজক কমিটি করা যেতে পারে। বাইচের সাথে সারি-ভাটিয়ালি গান, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী নৌকা নির্মাণ প্রদর্শনী যুক্ত করা হলে এটি পূর্ণাঙ্গ লোকসংস্কৃতি উৎসবে রূপ নিতে পারে।
তবে বড় আয়োজনের আগে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অনেকেই। লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধারকারী নৌকা, চিকিৎসক দল ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক নিশ্চিত করা জরুরি।
হাওরের পানি যদি নিকলীর প্রাণ হয়, নৌকা বাইচ তারই বৈঠার ছন্দ। সেই ছন্দ ফিরবে কি না- এখন সেটিই স্থানীয়দের প্রশ্ন।



