মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওর পাড়ের মৎস্যজীবীরা দেশীয় পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদন করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জনপদে শুঁটকি উৎপাদন এখন কেবল একটি পেশা নয়, বরং এক লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে উৎপাদিত উচ্চমানের এই শুঁটকি থেকে বছরে প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি আয় হচ্ছে।
সরেজমিন উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওর তীরের সোনাপুর, ইসলামপুর ও অন্তেহরি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে এক ব্যস্ততম চিত্র। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বাঁশের মাচায় রোদে শুকানো হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির হরেক রকমের মাছ। টেংরা, পুঁটি, চিংড়ি, মলা ও ছোট ছোট দেশীয় মাছের গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কার্তিক মাস থেকে শুরু করে চৈত্র মাস পর্যন্ত; এই ছয় মাস পুরো এলাকায় চলে শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ। বিশেষ করে সোনাপুর গ্রামে গড়ে উঠেছে বিশাল এক শুঁটকি পল্লী, যা স্থানীয়দের পাশাপাশি বহিরাগত ব্যবসায়ীদেরও অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সোনাপুর শুঁটকি পল্লীর মালিক হাদিস আহমদ জানান, তিনি দীর্ঘ ১০-১২ বছর ধরে এখানে প্রাকৃতিকভাবে শুঁটকি উৎপাদন করে আসছেন। মূলত তারা ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে এসে এখানে মৌসুমি আস্তানা গেড়েছেন। হাদিস আহমদ বলেন, আমার এই পল্লীতে নারীসহ অন্তত ৪০ জন শ্রমিক কাজ করেন। হাওরের জেলেরা সরাসরি বিল থেকে মাছ ধরে আমার ঘাটে এনে দেন। আমরা কোনো প্রকার রাসায়নিক বা বিষ ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে লবণ দিয়ে মাছ পরিষ্কার করে রোদে শুকাই। তিনি আরো জানান, প্রতি মৌসুমে তার এই এক পল্লী থেকেই প্রায় ২৫ হাজার কেজি শুঁটকি উৎপাদিত হয়। মানভেদে প্রতি কেজি শুঁটকি বাজারে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই হিসেবে এক মৌসুমে কেবল তার এই কেন্দ্র থেকেই দেড় কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। ময়মনসিংহের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে এই শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা ভালো মুনাফাও পাচ্ছেন।
হাওর পাড়ের সোনালোহা বিলের মৎস্যজীবী তিতু মিয়া ও সোনাপুর গ্রামের আবুবক্কর জানান, তাদের জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে এই হাওর। বছরের এই শুষ্ক মৌসুমে মাছের আধিক্য থাকায় তারা সরাসরি শুঁটকি উৎপাদনে জড়িয়ে পড়েন। প্রতিটি পরিবার গড়ে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। তবে এই শিল্পের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জেলেরা জানান, সংরক্ষণের জন্য কোনো আধুনিক ব্যবস্থা বা কোল্ড স্টোরেজ নেই। ফলে আকাশ মেঘলা থাকলে বা হঠাৎ বৃষ্টি হলে বিপুল পরিমাণ মাছ পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় প্রান্তিক জেলেরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন।
পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে এই শুঁটকি শিল্প বিদেশের বাজারেও রফতানি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত সংশ্লিষ্টরা। রাজনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ কে এম মহসীন বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে শুঁটকি উৎপাদনের বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। আমরা যদি এই মৎস্যজীবীদের আধুনিক শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ ও স্বাস্থ্যসম্মত ড্রায়ার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তবে উৎপাদনের মান ও পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে।



