শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পৌর সদরের পিপুলিয়া গ্রামে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে তিনটি সুতা প্রসেস মিল অ্যান্ড ডাইং কারখানা। কোনো প্রকার পরিশোধনাগার ছাড়া উন্মুক্ত স্থানে নির্গত এসব কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাসায়নিকযুক্ত কুচকুচে কালো বর্জ্যরে তীব্র দুর্গন্ধ এবং খালের পানির দূষণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পিপুলিয়া গ্রামের মধ্য ও পূর্বপাড়ায় অবস্থিত এসব কারখানার মালিক দুই ভাই ইন্তাজ মল্লিক ও মন্তাজ মল্লিক এবং মকলেছুর রহমান। তারা কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র কিংবা ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপন না করেই বছরের পর বছর ধরে কারখানাগুলো চালিয়ে আসছেন। অনিয়ম ঢাকতে তারা পরিবেশ অধিদফতর ও স্থানীয় প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সুতা প্রসেস ও রঙের কাজে এসিড, কস্টিক সোডা, ব্লিচিং পাউডারসহ মারাত্মক ক্ষতিকর নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, কারখানাগুলোতে নেই বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য কোনো নির্ধারিত সংরক্ষাণাগার বা প্ল্যান্ট। মিলের বয়লার ও ডাইং ইউনিট থেকে ভারী রাসায়নিক বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ফেলা হচ্ছে গ্রামের তিনটি খালে। সেখান থেকে অপচনশীল বর্জ্য খাল প্লাবিত করে উপচে পড়ছে পাশের ফসলি জমিতে। ভয়াবহ তথ্য হলো, কারখানার বর্জ্য অপপ্রয়োগের জন্য খালের মধ্যে গোপন পাইপ বসিয়ে তরল ভূগর্ভে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মক দূষিত হচ্ছে এবং বহু অগভীর নলকূপে উঠে আসছে দুর্গন্ধযুক্ত ও ঘোলা পানি। নিরুপায় হয়ে এই পানি ব্যবহারের ফলে গ্রামবাসীর মধ্যে চর্মরোগ, পেটের পীড়াসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
প্রভাবশালীদের ভয়ে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি অনেক বাসিন্দা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কলেজ শিক্ষার্থী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কারখানার ঝাঁঝালো রাসায়নিকের দুর্গন্ধে দিনরাত ঘরে টেকাই দায়। বর্জ্যরে দূষণে পুরো এলাকা বসবাসের অযোগ্য। সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে মালিকদের দহরম-মহরম থাকায় আমরা প্রশাসনে অভিযোগ জানাতেও ভয় পাই; প্রতিকার তো দূরের কথা, উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। স্থানীয়রা অবিলম্বে এসব বিষাক্ত কারখানা জনবসতি ও ফসলি জমি থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে দূষণের সার্বিক বিষয়ে সাঁথিয়া পৌরসভার প্রশাসক জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রসেস মিল বসানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই। প্রসেস মিলের বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য খালে ফেলার ফলে পানি ও সামগ্রিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলোতে ইটিপি স্থাপন ও বর্জ্য পরিশোধন করা সম্ভব হলে এই পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
অভিযোগের বিষয়ে মিল মালিক ইন্তাজ মল্লিক মুঠোফোনে জানান, তারা শিগগিরই ইটিপি বসানোর পরিকল্পনা করছেন। তবে বর্তমানে খালের ভেতরে বর্জ্য ফেলাকে তিনি নিরাপদ নিষ্কাশন বলে দাবি করেন এবং এতে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেন। ভূগর্ভে বিষাক্ত কেমিক্যাল পাঠানোর অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত ঝুঁকির বিষয়ে চিকিৎসাবিদ ডা: মায়িশা আক্তার সতর্ক করে বলেন, প্রসেস মিলের কেমিক্যাল মিশ্রিত পানির কারণে গভীর ও অগভীর নলকূপের পানিতে কলিফর্ম নামক ভয়াবহ জীবাণু সৃষ্টি হয়। এ পানি দীর্ঘ দিন পান ও ব্যবহার করলে পেটের পীড়া ও চর্মরোগ তো বটেই, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।
কৃষিতে প্রভাব সম্পর্কে সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মাহমুদুল হাসান বলেন, রাসায়নিক বর্জ্যরে প্রভাবে জমির উর্বরতা ও স্বাভাবিক ফলন ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। তরল কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে চারাগাছ বাড়ার আগেই কালো হয়ে মরে যায়, যা কৃষকদের বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলছে। নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও লিখিত অভিযোগ পেলে শিগগিরই আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার রিজু তামান্না জানান, কারখানাগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো লিখিত অভিযোগ এখনো পাননি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে জেনেছেন। খুব দ্রুত মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য দল পাঠানো হবে। পরিদর্শনে পরিবেশ বিনষ্ট ও জনস্বাস্থ্যের হুমকির সত্যতা পাওয়া গেলে কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।



