রেফারাল সিস্টেম চালু করতে পারলে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ হবে

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ডা: এম মোজাহেরুল হক

Printed Edition
রেফারাল সিস্টেম চালু করতে পারলে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ হবে
রেফারাল সিস্টেম চালু করতে পারলে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ হবে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: এম মোজাহেরুল হক। তিনি দীর্ঘদিন মেডিক্যাল শিক্ষা, মেডিক্যাল এথিকস নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি ওয়ার্ল্ড মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের মেডিক্যাল শিক্ষা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে সাক্ষাৎকারে তার সুচিন্তিত মতামত দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নয়া দিগন্তের বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য কী প্রয়োজন?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : বাংলাদেশে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে; কিন্তু সেগুলো খুব একটা ফাংশনাল না। এই দুই হাসপাতালকে শক্তিশালী করতে পারলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, গ্রামের মানুষ এখান থেকে সেবা পাবে; কিন্তু ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র কিংবা উপজেলা হাসপাতালে না গিয়ে রোগীরা জেলা অথবা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলে যায় চিকিৎসার জন্য। একটি অ্যাফেক্টিভ রেফারাল সিস্টেম নেই বলে মানুষ হাতের কাছের সরকারি হাসপাতালে সেবা নেয় না অথবা আরো উন্নত হাসপাতালে গেলেই সেবা পেয়ে যেতে পারে। যে ধরনের স্বাস্থ্যসেবা যেখানে পাওয়ার কথা রোগীদের সেখানে নেয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারে সরকার। অন্য দিকে রেফারাল সিস্টেম চালু করতে পারলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা না নিয়ে কেউ জেলা হাসপাতাল বিংবা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগই থাকবে না। প্রকৃত ব্যাপার হলো- এই দুই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে অধিকাংশ রোগ ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। রেফারেল সিস্টেম চালু হলে যেগুলো এর চেয়ে জটিল, উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকরা যেই চিকিৎসাটা দিতে পারবেন না কেবল সেই চিকিৎসার জন্য উপজেলা হাসপাতালের চিকিৎসকের রেফারেন্স নিয়ে রোগী যেতে পারবেন জেলা হাসপাতালে কিংবা অন্য কোনো জেনারেল হাসপাতালে। আবার জেলা অথবা জেনারেল হাসপাতালে কোনো রোগী সুস্থ না হলে কেবল তারাই যেতে পারবেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতাল (যেমন কিডনি, হৃদরোগের মতো বিশেষায়িত হাসপাতাল), সর্বশেষ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। এই সিস্টেম চালু করলে অধিকাংশ রোগী নিচের হাসপাতালগুলোতেই ভালো হয়ে যেতে পারবে। ফলে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল কিংবা সর্বশেষ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল আরো জটিল রোগ ও জটিল অস্ত্রোপচার করার সময় পাবে এবং তারা গবেষণাও করতে পারবে। যত শিগগির দেশে রেফারাল সিস্টেম চালু করা হবে মানুষ তত বেশি বিশেষায়িত হাসপাতাল থেকে ভালো সেবা পাবে। দেশে ভালো চিকিৎসাসেবা পেলে রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাও বন্ধ হবে।

নয়া দিগন্ত : উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালে রোগীরা যেতে চায় না কেন, তারা কেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ভিড় করে?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : উপজেলা হাসপাতালে সবধরনের চিকিৎসক পাওয়া যায় না, যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেখানে থাকার কথা সেগুলো করা যায় না। যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকা সাধারণ ব্যাপার সেখানে। সে কারণে উপজেলা হাসপাতালে রোগীরা যেতে চান না; বরং রোগীরা সরাসরি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলে যান। একটা উপজেলা হাসপাতালকে চিকিৎসায় স্বয়ং সম্পূর্ণ হতে হবে। সেখানে ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিককে সবসময় থাকতে হবে। সবসময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মেশিন সচল রাখতে হবে। মেশিন সচল থাকে না এবং ডাক্তার-নার্স পাওয়া যায় না বলেই মানুষ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে না। অ্যাম্বুলেন্সসহ সবধরনের যন্ত্রপাতি সচল থাকলে মানুষ উপজেলায় যেতে আগ্রহ বোধ করবে। আমি সরকারকে অভিনন্দন জানাতে চাই যে, সরকার প্রত্যেকটি ৫০ বেডের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ বেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই বেড বাড়ানোর সাথে সাথে ডাক্তার ও নার্সের পদ বাড়ানোর দাবিও করছি এবং তা সম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে। একই সাথে উপজেলায় এইচডিও এবং আইসিইউ মেশিন থাকলে রোগীরা আরো বেশি হারে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও আসতে উৎসাহিত বোধ করবে। ঘরের কাছে ভালো সেবা পেতে পারলে তারা কখনো দূরে যাবে না।

নয়া দিগন্ত : দেশে চিকিৎসক তৈরি করতে আর আর কত মেডিক্যাল কলেজ লাগবে?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : বাংলাদেশে আর কোনো মেডিক্যাল কলেজ প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। পাঁচ বছরের মেডিক্যাল শিক্ষার জন্য কী পরিমাণ শিক্ষক দরকার, আর কী পরিমাণ শিক্ষার্থী ভর্তি করা দরকার, তার ওপর ভিত্তি করে, নতুন নতুন কী ধরনের রোগের উদ্ভব হচ্ছে সেগুলোর ধরন অনুযায়ী এবং প্রতি বছর কী পরিমাণ জনসংখ্যা বাড়ছে সেই হিসাবের ভিত্তিতে মেডিক্যাল কলেজ দরকার চিকিৎসক তৈরি করতে। এখন যেভাবে মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে এর কোনো যুক্তি নেই। বেসরকারিতে তো বটেই সরকারি মেডিক্যাল কলেজে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। নতুন মেডিক্যাল কলেজ হতে হবে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর, প্রয়োজনের নিরিখে। সরকার একটি হেলথ ম্যানপাওয়ার স্ট্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করতে পারে। এই স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানই বলে দেবে আমাদের কী প্রয়োজন, কী প্রয়োজন নেই।

নয়া দিগন্ত : আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাটা হলো- ‘রোগ হলে ওষুধ দিতে হবে’ এই কৌশলের ওপর ভিত্তি করে কিন্তু রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা কেন শক্তিশালী করা হয় না। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘এই রোগ হলে ওষুধ’ কতটুকু পারফেক্ট?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : আমরা একটি স্বাস্থ্যবান জাতি চাই। স্বাস্থ্যবান জাতি হতে চাইলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। জাপানিজ, আমেরিকান বা ইউরোপিয়ানরা স্বাস্থ্যবান বলেই এরা উন্নত জাতি। স্বাস্থ্যবান জাতি উপহার দিতে হলে দুটো বিষয়ে প্রয়োরিটি থাকতে হবে, একটি হলো স্বাস্থ্য ও আরেকটি শিক্ষা। জাতিকে সুস্থ রাখতে হলে রোগ থেকে বেঁচে থাকার উপায় জানতে হবে। কিভাবে রোগ প্রতিরোধ করতে হয় তা স্কুলের শিশুদের শেখাতে পারলে শুরু থেকেই নিজেদের রোগজীবাণুমুক্ত জীবনযাপন করতে পারবে । প্রতিটি উপজেলাতে সেনেটারি ইন্সপেক্টরের একটি পদ আছে, তার কাজ হলো ভেজাল খাবার শনাক্ত করা। তারা যদি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন তাহলে ভেজাল খাদ্য থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারব। এ ছাড়া বায়ুদূষণ আরেকটি ফ্যাক্টর। বায়ুদূষণ রোধ করতে পারলে আমরা অনেক রোগ থেকে বেঁচে থাকতে পারব। এভাবে রোগ প্রতিরোধ করে আমরা স্বাস্থ্যবান জাতি হতে পারব।

নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশে এ বছরই প্রথম স্বাস্থ্য বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ। একটা ভালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য আর কোন কোন খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : প্রথম প্রাধান্য হবে রোগ প্রতিরোধ করা। আরেকটি হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকে শক্তিশালী করে প্রাথমিকভাবেই রোগকে শনাক্ত করে চিকিৎসা দিয়ে দেয়া। পরিহাসের বিষয় হলো স্বাস্থ্য বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ করা হয় সেই টাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ব্যয় করতে পারে না, কারণ বাজেট খরচ করার সক্ষমতা নেই। সে কারণে তারা বরাদ্দকৃত পুরো টাকা ব্যয় করতে পারে না। যেখানে দরকার সেখানে বাজেট দেয়া হয় না, আবার প্রচুর অপচয় হয়। কোনটায় বেশির ভাগ জনগণ উপকৃত হয় সেটাতে জোর দিতে হবে। টাকা খরচে দুর্নীতি রোধ করতে হবে।

নয়া দিগন্ত : স্বাস্থ্যে জনশক্তির প্রশিক্ষণের জন্য সরকার কী করতে পারে?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : একজন ডাক্তার পাস করলেই চিকিৎসার সর্বশেষ জ্ঞান পায় না। তাদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, এর জন্য এক্সিডিটেড বডি থাকে। একজন চিকিৎসক যত প্রশিক্ষণ নেবেন তার মূল্যায়ন তত বেশি হতে থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে এটি হয় না। একজন চিকিৎসক পাস করার পর যতদিন রোগীকে চিকিৎসা দেবেন ততদিন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি আপডেটেড হতে থাকবেন, তা না হলে তিনি চিকিৎসা দিতে পারবেন না। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করুন অথবা চাকরি করুন যেখানেই চিকিৎসক কাজ করবেন সেখানেই তাকে প্রশিক্ষণের মধ্যে থাকতেই হবে।

নয়া দিগন্ত : কোনো এক বাজেটে স্বাস্থ্যের গবেষণায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা ফেরত যায় খরচ করতে না পারায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গবেষণায় টাকা ব্যয় করতে পারে না কেন?

অধ্যাপক মোজাহেরুল হক : বাংলাদেশে কোয়ালিটিটিভ রিসার্চ হয় না বললেই চলে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি), বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে, মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ে, মেডিক্যাল কলেজে রিসার্চ সেল থাকা বাধ্যতামূলক । কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে কত রিসার্চ হয় অথবা তাদের রিসার্চ করার সক্ষমতা কতটুকু সেটি রিসার্চারমাত্রই জানেন। প্রশিক্ষণের জন্য যেমন মেডিক্যাল অ্যাডুকেশন ইউনিট থাকা বাধ্যতামূলক তেমনি বাংলাদেশে প্রতিটি মেডিক্যালে ইনস্টিটিউটগুলোতে রিসার্চ সেল থাকা বাধ্যতামূলক। মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোতে কাগজে-কলমে রিসার্চ আছে কিন্তু সেখানে মানসম্মত বা কোয়ালিটিটিভ রিসার্চ হচ্ছে না। আবার যারা করতে পারেন তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে না। সে কারণে গবেষণার টাকা ফেরত যায়। মানসম্মত রিসার্চ করার জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশে আর কোনো মেডিক্যাল কলেজ করার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, এর ওপর কোনো গবেষণা হলেও সেই গবেষণাতেই বেরিয়ে আসবে এখানে কোনো মেডিক্যাল কলেজ প্রয়োজন কি না। রিসার্চের ওপর চিকিৎসকদের মানসম্মত ও ঘন ঘন ট্রেনিং দেয়া উচিত।