চট্টগ্রামের ১৫ কিমি রিংরোড ১৫ বছরেও শেষ হয়নি

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition
  • ৫ বার সংশোধনে ব্যয় বেড়েছে ২৮৮ শতাংশ
  • ৪ বছরের প্রকল্প মেয়াদ গড়াল ১৬ বছরে

দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কচ্ছপের গতিতে। বছরের পর বছর ঝুলছে এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজ। চট্টগ্রাম নগরীর যানজট কমানো, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ সহজ করা এবং উপকূলীয় বাঁধকে শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প। ২০১১ সালে মাত্র ৮৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নেয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চার বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। কিন্তু ১৫ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে প্রকল্পটি এখন ব্যয়ের দিক থেকে তিন হাজার কোটি টাকার গণ্ডি ছাড়িয়েছে। পাঁচবার সংশোধনে প্রকল্পের খরচ বেড়েছে ২৮৮ শতাংশ বা দুই হাজার ৪৬৭ কোটি ৮৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকা বলে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা থেকে জানা গেছে। জানা গেছে, চার বছরের প্রকল্পটি ৫ দফায় বাড়িয়ে ১৬ বছরে উন্নীত হয়েছে।

প্রকল্প দলিল ও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের মাধমে সৃষ্ট সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে চট্টগ্রাম শহরের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের নিমিত্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণপূর্বক বাইপাস সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে শহরের অভ্যন্তরে ট্রাফিকব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যানজট হ্রাস করা এবং কর্ণফুলী নদীর মোহনায় টানেলের সাথে রাস্তার সংযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ঢাকাগামী দক্ষিণ চট্টগ্রামের যানবাহনগুলোকে চট্টগ্রাম শহর বাইপাসের সুবিধা সৃষ্টির জন্য প্রকল্পটি নেয়া হয়। শহর ও উপকূলীয় বাঁধের মধ্যস্থিত এলাকাগুলোতে বেসরকারি সেক্টরে আবাসন, বাণিজ্যিক ব্যবহার, পর্যটন শিল্প ও রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশকে উৎসাহিত করা। ২০১১ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নেয়া এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অর্থায়ন করছে জিওবি, জিওবি ঋণ এবং জাইকার প্রকল্প ঋণ। আগস্ট পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৯২.২৬ শতাংশ।

১৫.২ কিলোমিটার রিংরোডে ব্যয়ের লম্ফ

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প নথি ও পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল সড়কটি ১৫.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও চার লেনের। এর সাথে রয়েছে ফিডার রোড, ফ্লাইওভার, ইন্টারচেঞ্জ, রাউন্ড অ্যাবাউট, ওয়েভ-ডিফ্লেক্টেড ওয়াল এবং উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করার বিভিন্ন কাজ। শুধু ১৫.২ কিলোমিটার মূল সড়কের দৈর্ঘ্য ধরে মোট প্রকল্প ব্যয় ভাগ করলে শুরুতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়ত প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। চতুর্থ সংশোধনের ব্যয়ে তা দাঁড়ায় প্রায় ২১৯ কোটি টাকা এবং পঞ্চম সংশোধনের পর প্রায় ২২৪ কোটি টাকা প্রতি কিলোমিটার। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে শুধু মূল সড়ক নয়, ফ্লাইওভার, ফিডার রোড, বাঁধ, ভূমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো রয়েছে। ফলে পুরো ব্যয়কে শুধু সড়কের কিলোমিটার দিয়ে তুলনা করা সরাসরি প্রকল্পের ইউনিট কস্ট হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। তারপরও ব্যয়ের উল্লম্ফন প্রকল্পটির ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন সৃষ্টি করে বলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান।

জাইকার মূল্যায়নেও ধরা পড়েছে

ব্যয় ও সময়ের অদক্ষতা

প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রাম আউটার রিং রোড প্রকল্প নিয়ে জাইকার ২০২৩ সালের এক্স-পোস্ট মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। জাইকার মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনায় মোট ব্যয় ছিল ১৬ হাজার ৬৪৫ মিলিয়ন ইয়েন। কিন্তু বাস্তবে তা দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১২৯ মিলিয়ন ইয়েনে। অর্থাৎ পরিকল্পিত ব্যয়ের ২১৭ শতাংশ। বিশেষ করে সরকারি অর্থের অংশ পরিকল্পনার তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। জাইকার মূল্যায়ন প্রতিবেদনে প্রকল্পের দক্ষতাকে লো বা কম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, ফ্লাইওভার, ইন্টারচেঞ্জে গ্রেড-সেপারেটেড ব্যবস্থা, ওয়েভ-রিটার্ন ওয়াল ও ওয়াকওয়ে যুক্ত করা, মাটির উন্নয়ন এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে। একই সাথে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন ব্যয়ও বেড়েছে।

সময় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি

তথ্য থেকে দেখা যায়, মূল পরিকল্পনায় প্রকল্পের সময়কাল ছিল চার বছর ৪৮ মাস। বাস্তবে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ বছরে বা ১৯২ মাস। অর্থাৎ পরিকল্পিত সময়ের ৪০০ শতাংশ বেশি। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে নির্মাণকাজে বড় ধরনের বিলম্ব হয়। কিছু জমির মালিকের সাথে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিষ্পত্তিতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নির্মাণাধীন বাঁধের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি মেরামতেও সময় লাগে। কোভিডের সময় নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি পরে কাজ স্বাভাবিক গতিতে ফিরতেও সময় লেগেছে। শুরুতে ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চার দফায় এই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ একনেক কর্তৃক অনুমোদিত চতুর্থ সংশোধনীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

নকশা বদলেই বাড়ল বড় অংশের ব্যয়

সূত্রে জানা গেছে, ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। ফিডার রোড-৩-এ ফ্লাইওভার করা, ইন্টারচেঞ্জে গ্রেড-সেপারেশন, উপকূলীয় অংশে ওয়েভ-রিটার্ন ওয়াল ও ওয়াকওয়ে যুক্ত করা এবং নরম মাটির কারণে অতিরিক্ত ভরাট এসব কারণে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প দীর্ঘায়িত হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও শ্রমের মূল্যও বেড়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে মৌজা মূল্যবৃদ্ধি, ক্ষতিপূরণের সরকারি হার পরিবর্তন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ও উল্লেখ করেছে জাইকা।

তবে সুফলও মিলেছে

সংশ্লিষ্টদের থেকে জানা গেছে, আউটার রিং রোড নগরীর বিকল্প যোগাযোগপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ঢাকা ও কক্সবাজারমুখী আঞ্চলিক পণ্য পরিবহনে সহায়তা করছে। কর্ণফুলী টানেলের সাথে সংযোগের মাধ্যমে নগরীর উত্তর অংশের রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং দক্ষিণ অংশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর যোগাযোগও উন্নত হয়েছে। ফলে প্রকল্পটি কার্যকর হচ্ছে। ২০২৪ সালে আউটার রিং রোডে দৈনিক প্রায় ৩৯ হাজার যানবাহন চলাচল করছিল। একই সময়ে পুরনো সড়কে চলছিল প্রায় ৪১ হাজার যানবাহন। অর্থাৎ বিকল্প সড়ক হিসেবে আউটার রিং রোডে উল্লেখযোগ্য যানবাহন স্থানান্তর হয়েছে।

প্রকল্পের মূল সড়ক তৈরি হলেও পূর্ণ সুফল বাকি

চউকের সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যায়, প্রকল্পের মূল সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি টানেল জংশন, সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ভৌত অগ্রগতি ছিল প্রায় ৮৯.২০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৬.৫৭ শতাংশ। টানেল জংশনের ফ্লাইওভারের পাইলিং এবং দুই পাশে রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজ তখনও চলছিল। দেখা যায়, প্রকল্পের মূল সড়ক যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হলেও ফিডার রোড ও অন্যান্য সংযোগ অবকাঠামোর কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে

চট্টগ্রামের আউটার রিং রোড প্রকল্পের গল্প তাই শুধু একটি সড়ক নির্মাণের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির একটি বড় উদাহরণ। ২০১১ সালে ৮৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প, একাধিক সংশোধনের পর ২০২৬ সালে এসে প্রায় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটির সামগ্রিক প্রভাব ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়ন দক্ষতা কম। কারণ ব্যয় ও সময় উভয়ই পরিকল্পনার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে এখন বড় প্রশ্ন- পঞ্চম সংশোধনের পরও কি এবার সত্যিই শেষ হবে ১৫.২ কিলোমিটারের এই বহুল প্রতীক্ষিত আউটার রিং রোড, নাকি আবারো বাড়বে সময় ও ব্যয়ের খাতা?

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল সাথে গতকাল বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই প্রকল্পটি কাজ পুরোপুরি শেষ হবে। কাজ বৃদ্ধির কারণে সময় ও খরচ বেড়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ, এ বিষয়ে মামলাসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ থেকে সময় বেশি লেগেছে। তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কাজ যুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির সামান্য কাজ বাকি আছে, যা ডিসেম্বরেই শেষ হবে।