জলবায়ু সঙ্কটে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাড়তি সহায়তার দাবি

Printed Edition

শাহ আলম নূর জার্মানির বন থেকে

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় বিশ্বনেতারা একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জার্মানির বন শহরে চলমান জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মধ্যবর্তী বৈশ্বিক আলোচনা (এসবি-৬৪) সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলো বলছে, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া জলবায়ু কর্মসূচির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ফলে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান কমানোর দাবি আরো জোরালো হয়েছে।

সম্মেলনের শেষপর্যায়ের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে অভিযোজন, ন্যায্য রূপান্তর, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণ এবং জলবায়ু অর্থায়ন, সব ক্ষেত্রেই বাস্তব অগ্রগতির জন্য কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামো প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতে, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় ঘোষিত লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা জরুরি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অধিকাংশ দেশ নীতিগতভাবে বিভিন্ন জলবায়ু উদ্যোগের সাথে একমত হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও অর্থায়ন কাঠামোর দাবি জানাচ্ছে, যা সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। অন্য দিকে কিছু দেশ এখনো কর্মশালা, প্রতিবেদন ও সমন্বয়ভিত্তিক প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ন্যায্য রূপান্তর (জাস্ট ট্রানজিশন) নিয়ে আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলো একটি কার্যকর ‘জাস্ট ট্রানজিশন মেকানিজম’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, এর মাধ্যমে অর্থায়ন সংগ্রহ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জাতীয় ও স্থানীয়পর্যায়ে রূপান্তর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থার পরিধি ও কাঠামো নিয়ে এখনো সব দেশের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।

সম্মেলনে অভিযোজন বিষয়ক আলোচনায়ও অর্থায়নের প্রশ্নটি গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বলেছে, বৈশ্বিক অভিযোজন লক্ষ্য নির্ধারণ কেবল সূচক ও প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব সুফল বয়ে আনবে না। জি-৭৭ ও চীনের পক্ষ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন তিনগুণ বাড়ানোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

এ দিকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের বিষয়েও আলোচনা এগিয়েছে। কপ৩১ সভাপতিমণ্ডলী ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পর্যায়ে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য সামনে এনেছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতে, এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্থায়নের উৎস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দেশভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়ে আরো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। প্রতিনিধিরা মনে করেন, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকে সম্মেলনের স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভিসা জটিলতার কারণে অনেক আলোচক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি বন সম্মেলনে অংশ নিতে পারেননি। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি, অভিযোজন কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। প্যারিস চুক্তির আওতায় দেশগুলোকে নিয়মিতভাবে তাদের জলবায়ু কর্মসূচির অগ্রগতি, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ, অভিযোজন উদ্যোগ এবং প্রাপ্ত ও ব্যবহৃত অর্থায়নের তথ্য প্রকাশ করতে হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশ্বনেতা, আলোচক ও বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, জলবায়ু স্বচ্ছতা শুধু আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যা দেশগুলোকে নিজেদের জলবায়ু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে, নীতিনির্ধারণকে আরো তথ্যভিত্তিক করে এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখে।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়া যথেষ্ট নয়; বরং সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। আর সে কারণেই স্বচ্ছতা কাঠামোকে জলবায়ু ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির আওতায় গঠিত এনহ্যান্সড ট্রান্সপারেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক (ইটিএফ) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই কাঠামোর অধীনে দেশগুলোকে নির্দিষ্ট সময় পরপর দ্বিবার্ষিক স্বচ্ছতা প্রতিবেদন (বিটিআর) জমা দিতে হয়। প্রতিবেদনে একটি দেশের কার্বন নিঃসরণ, অভিযোজন কার্যক্রম, জলবায়ু অর্থায়নের ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরা হয়। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রতিবেদন শুধু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তথ্য দেয়ার জন্য নয়; বরং জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে সরকারগুলো নিজেদের অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলো আরো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। এসব ক্ষতি মোকাবেলায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, যার একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ তথ্য অপরিহার্য। কোনো দেশ যদি স্পষ্টভাবে দেখাতে পারে যে জলবায়ু অর্থায়ন কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে কী ফলাফল অর্জিত হয়েছে, তাহলে ভবিষ্যতে নতুন অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

বন বৈঠকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, স্বচ্ছতা কাঠামোর আওতায় দায়িত্বগুলো কার্যকরভাবে পালন করতে অর্থ ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু অনেক দেশ এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছে না, ফলে প্রতিবেদন প্রস্তুত ও তথ্য ব্যবস্থাপনার কাজ ধীরগতির হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে কম দায়ী দেশগুলোই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তাই তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর হোসেন মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, আলোচনায় অংশ নেয়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও স্বীকার করেছে যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি জরুরি। তিনি বলেন, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক দেশ প্রথমবারের মতো নতুন স্বচ্ছতা কাঠামোর আওতায় প্রতিবেদন তৈরি করছে এবং এ ক্ষেত্রে নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্যও এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি এক দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, অন্য দিকে অভিযোজন ও সহনশীলতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্য তথ্য, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন জলবায়ু বৈঠকের আলোচনাগুলো স্পষ্ট করেছে যে, জলবায়ু স্বচ্ছতা এখন আর শুধু প্রতিবেদন তৈরির বিষয় নয়; এটি কার্যকর নীতি গ্রহণ, অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং বাস্তব ফলাফল অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একই সাথে জলবায়ু প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি আরো জোরালো হয়েছে।