রাতে পাহারায় হিমশিম খাচ্ছে বিজিবি, টর্চ লাইটই ভরসা

উত্তরাঞ্চলে সীমান্তের ১৫ স্পট পুশইনের ঝুঁকিতে

Printed Edition

সরকার মাজহারুল মান্নান রংপুর ব্যুরো

আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ৬ জেলায় ৭ দিনে ১২৪ জনকে পুশইন করেছিল। কিন্তু বিজিবি এবং স্থানীয়দের বাধার মুখে শূন্য রেখা থেকে তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ। বিজিবির সাথে গ্রামবাসী কড়া পাহারা বসালেও আলো না থাকায় রাতের বেলা বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। টর্চলাইটের ওপর ভরসা করেই চলছে পাহারা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আতঙ্কের সাথে উত্তেজনা ছড়িয়েছে সীমান্তে। সারা দেশের সীমান্তের ৭০টি পুশইন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে ১৫টি স্পটই উত্তরাঞ্চলে।

বাংলাদেশের সাথে ভারতের স্থল সীমার দৈর্ঘ প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ষোল জেলায় সীমান্ত রয়েছে ১ হাজার ৬০২ কিলোমিটার। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের ৬ জেলায় ৮৫১ কিলোমিটার এবং রাজশাহী বিভাগের চার জেলায় ৭৫১ কিলোমটার। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনের পর ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজিপি জয়ী হওয়া এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর ১ হাজার ৫০২ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে অবৈধ পুশইন কার্যক্রম শুরু করেছে বিএসএফ।

বিজিবি সদর দফতরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ মোট ২ হাজার ৩৪৪ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছিল। ৭ মে পর্যন্ত কোনো পুশইনের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে বিজিবি। তবে ৮ মে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঢেলে পাঠায় বিএসএফ। এর পর থেকে আবার একের পর এক ঘটতে থাকে পুশইন ও পুশইনের চেষ্টা।

উত্তরাঞ্চলের সীমান্তের ১৫টি স্থান পুশইনের ঝুঁকিপূর্ণ

বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের যেসব এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে পুশইন করার আশঙ্কা রয়েছে, এমন প্রায় ৭০টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিজিবি। এর মধ্যে কিছু স্থানে পুশইনের আশঙ্কা বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ ৭০টি স্থানের মধ্যে উত্তরাঞ্চলেই ১৫টি স্পট আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড় সদরের রওশনপুর ও প্রধানপাড়া; ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর, লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারী, সদরের দুর্গাপুর, আদিতমারীর দিঘলটারি, হাতিবান্ধার বড়খাতা, পাটগ্রামের ঝালাঙ্গি; কুড়িগ্রামের রৌমারীর বড়াইবাড়ী, জয়পুরহাটের কয়া ও বাসুদেবপুর; নওগাঁর সাপাহার, পোরশা; চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, গোমস্তাপুরসহ সীমান্তবর্তী দুর্গম ও জনবসতিহীন সীমান্তপথের কয়েকটি স্থানেও লোকজন জড়ো করে বাংলাদেশে পুশইনের আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, এরই ধারাবাহিকতায় উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত টার্গেট করেছে বিএসএফ। বুধবার (৩ জুন) থেকে মঙ্গলবার (৯ জুন ) সন্ধ্যা পর্যন্ত এই অঞ্চলের সীমান্তের ৬ জেলায় ৯টি পয়েন্ট দিয়ে ১২৪ জনকে পুশইন করেছিল বিএসএফ। বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ-বিজিবি এবং স্থানীয় জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে সরাসরি প্রবেশ করাতে ব্যর্থ হয়। তবে অবৈধ পুশইনের শিকার ব্যক্তিগণ শূন্য রেখায় অবস্থান করার পর তা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

পুশইন ঠেকাতে বিজিবির পাশে গ্রামবাসী

বিজিবি এবং সীমান্ত এলাকা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, উত্তরের পুরো ১ হাজার ৫০২ কিলোমিটার সীমান্তজুড়েই কড়া পাহারা বসিয়েছে বিজিবি। পোশাকী বিজিবির পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তাদের সাথে আছে এলাকাবাসী। রাতে সরেজমিন দেখা গেছে, বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি সীমান্তের প্রত্যেকটি বাড়ির মহিলা পুরুষ রাত জেগে বিজিবিকে সঙ্গ দিচ্ছেন।

সীমান্তে আলো নেই, টর্চ লাইটে পাহারা দেয়া কষ্টকর:

সীমান্ত এলাকা জুড়ে ভুট্টা, ধানক্ষেতসহ বিভিন্ন আবাদ থাকার কারণে পাহারা দেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাতের বেলা। গত রোববার ৭ জুন রাত ৩টায় লালমনিরহাটের দুর্গাপুর সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, রাতের বেলা ভুট্টাসহ বিভিন্ন আবাদের ফাঁকে ডিউটি করছে এলাকাবাসী। প্রতিটি আইল এবং রাস্তার ধরে তারা পাহারা দিচ্ছেন। টর্চ লাইটের আলোয় করা হচ্ছে ডিউটি। কোনো ধরনের বাতি না থাকায় অনেক অসুবিধা হচ্ছে। তবুও ডিউটি দিচ্ছেন সীমান্তবাসীসহ বিজিবি। একপর্যায়ে দেখা গেল সীমান্তের ওপারে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছে। তখন মাইক হাতে বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়ন লালমনিরহাটের কমান্ডিং অফিসার ‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম, পিএসসি’ মাইকিং শুরু করে ঘোষণা দেন, ‘শূন্য লাইনে যে সমস্ত দুষ্কৃতকারী দেখা যাচ্ছে। ভুলেও বাংলাদেশের ভুখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করবেন না। কাউকে বাংলাদেশের ভুখণ্ডে প্রবেশ করতে দেখামাত্রই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সাবধান! ৫ মিনিট সময় দেয়া হলো। কেউ যদি ঝোঁপঝাড়ে লুকিয়ে থাকেন এখনি চলে যান।’

সরেজমিন আরো দেখা যায় বিজিবি ও গ্রামবাসী এক হয়ে শপথ নিচ্ছেন। কাউকে পুশইন করতে দিবেন না। গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বিজিবিকে বলতে শোনা যায়, আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। সহযোগিতা করবেন। তখন গ্রামবাসীও তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবে এখন কাটছে সীমান্তে বিজিবি ও গ্রামবাসীর রাতদিন।

ফুলবাড়ী সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে বিজিবির কড়া নজরদারি

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) সংবাদদাতা জানান, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সম্ভাব্য পুশইন প্রচেষ্টা ঠেকাতে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ফুলবাড়ী ২৯ (বিজিবি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলা ভাষাভাষী কিছু ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও এবং দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ কয়েকজনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান ও তৎপরতার কারণে এসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি।