বুটেক্স শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাংলা নববর্ষ

Printed Edition

শেফাক মাহমুদ, বুটেক্স প্রতিনিধি

চৈত্র বিদায়ের পর নবজীবনে নতুনত্বের রোমাঞ্চকর যেই অনুভূতির কুঁড়ি জন্মায়, তাই মূলত বৈশাখের শুরু কিংবা নববর্ষের নতুন বার্তা। দিনপঞ্জিকার পাতায় ১৪৩২ বঙ্গাব্দকে বিদায় জানিয়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের আগমন। কালের খেয়ায় যুক্ত হলো আরেকটি নতুন বছর। পুরনো বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে, নব ভাবনা ও নতুন স্বপ্নের প্রত্যাশা নিয়ে নতুনের কেতন উড়িয়ে আমরা নব আহ্বানে সঞ্জীবিত হয়ে উঠি। মুঘল সম্রাট আকবরের হাত ধরে ফসলি সন থেকে বঙ্গাব্দ এবং পরে বাংলা বর্ষ নামের এক বাংলা পঞ্জিকার উৎপত্তি হয়। আর কালের পরিক্রমায় বাংলা নববর্ষ হয়ে উঠেছে বাঙালির অন্যতম উৎসব। নতুন বছরকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মেরও রয়েছে নানা কল্পনা-পরিকল্পনা আর আশা-প্রত্যাশা। তদ্রƒপ বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিদ্যালয় (বুটেক্স) শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আছে সজীবতা ও নতুনত্বের ভাবনা। আজ তাদের মুখেই শুনে নেবো নিজেদের পয়লা বৈশাখের অনুভূতি ও চিন্তাধারা।

৪৭তম ব্যাচের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম সাঈদ বলেন, ‘বাংলা নববর্ষ আমার কাছে শুধু পঞ্জিকার পাতা বদলানো নয়। এটা আমাদের শিকড়ে ফেরার দিন। বাংলার মাটি, মানুষ আর সংস্কৃতির সাথে নতুন করে পরিচিত হওয়ার দিন। সাহিত্য, শিল্প আর ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত না থাকলে একজন মানুষ অসম্পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’; সেই আহ্বান যেন আজও আমাদের মনে একটা নাড়া দিয়ে যায়। নতুন বছরে তাই কেবল বস্তুগত সাফল্য নয়, ক্যাম্পাসের মানুষগুলো যেন তার ভেতরের সত্তাটাকেও আরো শুদ্ধ করে গড়ে তুলতে পারে সেই কামনা করছি। ক্যাম্পাসের পরিধি ছোট হলেও এখানকার মানুষগুলোর মন ও চিন্তার পরিধি যেন বড় হয়, নববর্ষের সূচনা লগ্নে সেই কামনাই করছি। শুভ হোক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।’

শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে ৪৮তম ব্যাচের টেক্সটাইল মেশিনারিজ ডিজাইন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী অতুলন ভট্টাচার্য জানান, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশের আগে পরিবারের সাথেই নববর্ষ উদযাপন করতাম। সেসময় আমাদের এলাকায় চৈত্রসংক্রান্তি ও পয়লা বৈশাখের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতাম। তারপর পরিবারের সাথে ঘুরতে যেতাম ও খাওয়া-দাওয়া করতাম। কিন্তু বর্তমান সময়ে নববর্ষ পালন করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনেক ধন্যবাদ যে গত দুই বছর যাবৎ পরিবার ছেড়ে থাকা আমাদের মতো শত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৈশাখী উৎসব আয়োজন করার জন্যে। পয়লা বৈশাখ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য দিন। তাই আমি আশা রাখব আমরা সবাই সংস্কৃতিপরায়ণ হবো। একই সাথে নিজেদের সংস্কৃতি ও জাতিসত্তাকে ধারণ করব। দেশ ও জাতির মঙ্গলে কাজ করে যাব।”

৪৯তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী অমিত বনিক হৃদয় জানান, ‘পয়লা বৈশাখ আমার কাছে শুধু একটি তারিখ নয়, এটা আমাদের অস্তিত্বের উৎসব ও আমাদের প্রাণের স্পন্দন। পরীক্ষার চাপ, অ্যাসাইনমেন্টের স্তূপ, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় অবরুদ্ধ জীবনে পয়লা বৈশাখ এক টুকরো শান্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়। নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। পয়লা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে যায় যে জীবনটা শুধু বইয়ের পাতায় নয়। জীবনটা আছে বটগাছের ছায়ায় বসে শোনা রবীন্দ্রসঙ্গীতে, আছে একটা বাচ্চার হাতে রঙিন বেলুনের দুলুনিতে। তাই তো কবিগুরুর আহ্বান, নব আনন্দে জাগো আজি নব রবি কিরণে শুভময় হোক নতুন বছর।’

৫০তম ব্যাচের ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আনিকা ফারিহা জানান, ‘আমার কাছে বৈশাখের আমেজ শুরু হতো এপ্রিল মাসের প্রথম থেকেই। আব্বু নতুন জামা কিনে আনতেন। সেটি পড়ে ছোট ভাইকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম বৈশাখী মেলায়। তবে বর্তমান সময়ে পয়লা বৈশাখ অন্য আমেজ নিয়ে হাজির হয়। যান্ত্রিকজীবন ছেড়ে পরিবারের মানুষের সাথে মিলে পান্তা-ইলিশ খাবার সুযোগ না হলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বান্ধবীদের সাথে নিয়েই এই দিনটা উপভোগ করি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা আয়োজন ও সজীবতার পরশে পালিত হয় নববর্ষের অনুষ্ঠান। তাতে আমি অংশ নেবার চেষ্টা করি ও মুহূর্তগুলো ধারণ করি। যেহেতু পয়লা বৈশাখ বাঙালিয়ানাকে তুলে ধরে, আমি চাই আমাদের চারপাশের মানুষজন নিজ দেশ ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসে। পুরনো ব্যর্থতা এবং গ্লানিকে ভুলে গিয়ে নতুন উদ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সব মানুষের জীবনে অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে শুভশক্তির আবির্ভাব ঘটে।’