বিশ্বের সবচেয়ে বড় পলল সরবরাহব্যবস্থা বা ‘সেডিমেন্ট ফিল্টার’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ উপকূল ও বঙ্গোপসাগর। প্রতি বছর হিমালয় পর্বতমালা থেকে প্রায় এক শ’ কোটি টনেরও বেশি পলি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করে মেঘনা মোহনা হয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে জমা হয়। তবে এই সুবিশাল পললরাশিতে কোন নদীর অবদান কতটুকু, খনিজ পদার্থের ভূতাত্ত্বিক রূপান্তর কিভাবে ঘটছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই পললে লুকিয়ে থাকা খনিজসম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা সম্ভাবনাময়- তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটাতে আন্তর্জাতিক ভূ-বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ইতালির মিলানো-বিকোকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্রান্সে অবস্থিত ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের (সিএনআরএস) একদল গবেষকের যুগান্তকারী এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মিনারেলস’-এ (গরহবৎধষং ২০১৯, ৯(১০), ৬৪২)। ইতালীয় অধ্যাপক এডুয়ার্ডো গারজান্টি (ঊফঁধৎফড় এধৎুধহঃর)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় বঙ্গোপসাগরের অগভীর তলদেশ (বেঙ্গল শেলফ) এবং মেঘনা মোহনার বালুর গঠন, খনিজতত্ত্ব এবং ভূ-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রের প্রাধান্য : পলির বেশির ভাগই আসছে পূর্ব হিমালয় থেকে
গবেষণাপত্রের তথ্যানুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগে ও মোহনায় জমা হওয়া পলল রাশিতে গঙ্গার তুলনায় ব্রহ্মপুত্র নদের প্রভাব বহুগুণ বেশি। বিভিন্ন খনিজ উপাদান, পেট্রোগ্রাফিক পরীক্ষা এবং স্ট্রনশিয়াম ও নিওডিমিয়াম আইসোটোপ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে:
ব্রহ্মপুত্র নদের অবদান : মোট পলির প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ। গঙ্গা নদীর অবদান : মাত্র ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ।
গবেষকরা জানান, ব্রহ্মপুত্র নদ পূর্ব হিমালয়ের অত্যন্ত ঢালু ও চরম ক্ষয়প্রবণ এলাকা (ঊধংঃবৎহ ঐরসধষধুধহ ঝুহঃধীবং) দিয়ে প্রবাহিত হয়। মনসুনের মৌসুমে প্রবাল বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি নদীর তীব্র স্রোতের কারণে এই অঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণে ভারী খনিজ বঙ্গোপসাগরে ভেসে আসে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ব্রহ্মপুত্র নদ গঙ্গার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ ক্যালসিয়াম-প্লাজিওক্লেস এবং এপিডোট খনিজ বহন করে আনে। এই খনিজগুলোই মূলত বঙ্গোপসাগরের পললে স্ট্রনশিয়াম ও নিওডিমিয়াম আইসোটোপের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
সমুদ্রের তলদেশে খনিজের সুবিন্যাস : প্রাকৃতিক সোর্টিং
মোহনা থেকে বঙ্গোপসাগরের গভীরে পলি পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় স্রোতের তীব্রতা ও খনিজের স্বকীয় গুণাগুণ এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করে:
১. ভারী খনিজের অবস্থান : এমফিবোল, এপিডোট এবং গার্নেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভারী খনিজগুলো উপকূলীয় ও অগভীর সাগরে দ্রুত থিতিয়ে পড়ে।
২. মাইকা ও হালকা খনিজ : হালকা ও পাতলা প্রকৃতির অভ্র (গরপধ) কণাগুলো পানির মধ্যভাগে ভেসে বহুদূর চলে যায় এবং সাগরের গভীর ও কম-স্রোতযুক্ত ‘আউটার শেলফে’ গিয়ে জমা হয়।
৩. ওওয়েড ও জৈব উপাদান : সমুদ্রের বেশ গভীরে (যেমন সাগরের ১২৬ মিটার গভীরে) বালুর সাথে বিভিন্ন ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীবের কঙ্কাল ও ওওয়েড মিশ্রিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা অতীত ভূ-প্রকৃতির ইতিহাস বহন করে।
ব্লু-ইকোনমি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা : ভারী খনিজের বাণিজ্যিক বাজার
গারজান্টি ও তার দলের ভূ-রাসায়নিক গবেষণায় জিরকন (তরৎপড়হ), টাইটানাইট (ঞরঃধহরঃব), মোনাজাইট (গড়হধুরঃব), গার্নেট (এধৎহবঃ), ইলমেনাইট ও রুটাইল (আয়রন-টাইটানিয়াম অক্সাইড) সহ প্রচুর পরিমাণে উচ্চ ঘনত্বের ভারী খনিজের সন্ধান মিলিয়েছে। মোহনার গতিবিদ্যায় সোর্টিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব খনিজ উপকূলীয় বালুচরে বাণিজ্যিকভাবে আহরণযোগ্য ঘনমাত্রায় জমা হয়। এই খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহার বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
১. শিল্প খাতে ব্ল্যাক স্যান্ড ও রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট (জঊঊ)
মোনাজাইট ও থোরিয়াম: গবেষণায় সংগৃহীত নমুনায় মোনাজাইট ও থোরিয়ামের (ঞয) মতো বিরল মৃত্তিকা উপাদানের (জধৎব ঊধৎঃয ঊষবসবহঃং- জঊঊ) উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি প্রযুক্তি এবং পারমাণবিক শক্তির কাঁচামাল হিসেবে এসব উপাদানের বৈশ্বিক চাহিদা আকাশচুম্বী।
জিরকন ও রুটাইল: মহাকাশ প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স, সিরামিক শিল্প এবং উচ্চমানের পেইন্ট তৈরিতে জিরকন ও রুটাইল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জিরকনের প্রতি টনের মূল্য বেশ চড়া।
২. আমদানিনির্ভরতা হ্রাস ও বিলিয়ন ডলারের রফতানি সম্ভাবনা
বাংলাদেশ বর্তমানে সিরামিক, ইলেকট্রনিক্স ও টেক্সটাইল ডাইং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বহু কাঁচামাল বিপুল বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করে। বঙ্গোপসাগরের এই খনিজ বালু সঠিকভাবে আহরণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে দেশীয় শিল্পের কাঁচামালের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বছরে শত শত মিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি করা সম্ভব।
৩. কর্মসংস্থান ও উপকূলীয় শিল্পের বিকাশ
কক্সবাজার থেকে শুরু করে কুয়াকাটা ও সুন্দরবনের মহীসোপান অঞ্চল পর্যন্ত যদি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে ভারী খনিজ পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট (গরহবৎধষ ঝবঢ়ধৎধঃরড়হ চষধহঃ) গড়ে তোলা যায়, তবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত : সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, ‘প্রতি বছর কোটি কোটি টন পলি বঙ্গোপসাগরে আসছে, যার একটি বড় অংশ মূল্যবান খনিজের ভাণ্ডার। সঠিক মাইনিং নীতির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা করে এই পলি প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে তা বাংলাদেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
ভূ-বিজ্ঞানে সতর্কতা : প্রাচীন শিলায় সরাসরি প্রয়োগ নয়
গবেষকদল আধুনিক সমুদ্র তলদেশের এই চিত্র তুলে ধরার সাথে সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সতর্কতাও জারি করেছেন। তারা বলেছেন, আজকের মেঘনা মোহনা বা বেঙ্গল শেলফে যে খনিজগুলোর বিন্যাস দেখা যাচ্ছে, তা কেবল সাম্প্রতিক অতীতের ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্যই প্রযোজ্য।
যেসব পলি বা পলল শিলা ভূ-গর্ভের কয়েক শ’ মিটারের বেশি গভীরে চাপা পড়েছে কিংবা যেগুলো ‘লেট-প্লিস্টোসিন’ যুগের চেয়ে পুরনো, সেগুলোতে ভূ-গর্ভস্থ রাসায়নিক বিক্রিয়া ও দ্রবীভবনের (ঝবষবপঃরাব ঈযবসরপধষ উরংংড়ষঁঃরড়হ) কারণে অনেক নরম বা সংবেদনশীল খনিজ ক্ষয় হয়ে যায়। ফলে লাখ লাখ বছর আগের প্রাচীন শিলায় গঙ্গা বা ব্রহ্মপুত্রের অবদান হুবহু এভাবে মেপে বের করা কঠিন হতে পারে।
সম্ভাবনা ও পরিবেশের ভারসাম্য
বেঙ্গল ডিপ-সি ফ্যান (ইবহমধষ উববঢ়-ঝবধ ঋধহ)-এর গতিপ্রকৃতি এবং সুপ্ত খনিজসম্পদের পরিমাণ বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক এই গবেষণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উন্মোচিত এই খনিজ ভাণ্ডার কেবল বিজ্ঞানমনস্ক কৌতূহল মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনেরও এক শক্তিশালী চাবিকাঠি। তবে এই সম্পদ আহরণের সময় বঙ্গোপসাগরের ভঙ্গুর উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারির জন্য নীতি-নির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।


