আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ গুলজার মামা। কারণটা খুব সোজা। মামার বিশ্বাস, আমি ছোট হলেও মাথার ভেতর বুদ্ধি বেশ ভালোই আছে। কোনো ঝামেলায় পড়লেই তিনি আমার কাছে আসেন।
গত মাসে মোবাইলের প্যাটার্ন লক ভুলে গিয়েছিলেন। আমি বললাম, যেটা বেশি মনে নেই, সেটাই আগে দাও। তিনবার ভুল দেয়ার পর হঠাৎ ঠিকটাই দিয়ে ফেললেন। তার পর থেকে তিনি সবাইকে বলেন, ‘তুহিনের বুদ্ধির কাছে মোবাইলও হার মেনে যায়।’ এ কথা শুনে আমার লজ্জা লাগে। আবার ভালোও লাগে।গুলজার মামা ফুটবল খুব ভালোবাসেন। আমাদের এলাকায় কার গোল কত মিনিটে হয়েছে, কে অফসাইডে ছিল, কোন রেফারি ভুল বাঁশি দিয়েছে সব তার মুখস্থ। টেলিভিশনে খেলা দেখার সময় তিনি এত জোরে নির্দেশ দেন যে মাঝে মধ্যে মনে হয় খেলোয়াড়রা শুনে ফেলবে।
গতকাল বিকেলে মামা এমন দৌড়ে আমাদের বাড়িতে এলেন, যেন তাকে জাতীয় দলে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আমি উঠানে আম কুড়াচ্ছিলাম। মামা দূর থেকেই বললেন, তুহিন! সুখবর! আমি আম রেখে ছুটে গেলাম। কী হয়েছে?
মামা বুক ফুলিয়ে বললেন, আমি এখন রেফারি। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম তিনি মজা করছেন। কিন্তু না। তিনি পকেট থেকে একটা নতুন চকচকে বাঁশি বের করলেন। দেখ। ক্লাব থেকে দিয়েছে।
আমি বাঁশিটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলাম। মামা বললেন, কাল বিকেলে পাড়ার ফাইনাল ম্যাচ। আমি বাঁশি বাজাব।
আমি খুশি হয়ে বললাম, বাহ! তাহলে আমি তোমার সঙ্গে যাবো।
মামা এবার মাথা নাড়লেন না। বরং বললেন, যাবি তো অবশ্যই।
আমি অবাক।
সত্যি?
হ্যাঁ।
তিনি চার দিকে তাকিয়ে গলা নামালেন।
রেফারিরও একজন বুদ্ধিমান লোক লাগে।
আমার বুকটা ফুলে উঠল।
আমি কী করব?
মামা বললেন, যদি কেউ অফসাইড বলে চিৎকার করে, তুই আগে আমার দিকে তাকাবি। আমি যদি কিছু না বুঝি, তুই চোখের ইশারা দিবি।
আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম।
কিন্তু মামা, আমি তো অফসাইড ঠিকমতো বুঝি না।
মামা হেসে বললেন, আমি-ও বুঝি না।
আমি চুপ। মামাও চুপ। তারপর দু’জন একসাথে হেসে ফেললাম। সন্ধ্যায় মামা অনুশীলন শুরু করলেন। মাঠে না। বাড়ির উঠানে। বাঁশি বাজিয়ে হাঁটছেন। কখনো ডান হাত সোজা করছেন। কখনো বাঁ হাত। মাঝে মধ্যে নিজের কাছেই বলছেন, ‘ফাউল’। আবার একটু পর, ‘খেলা চালাও’। নানাজান বারান্দা থেকে অনেকক্ষণ দেখলেন। তারপর খবরের কাগজ ভাঁজ করে বললেন, গাধাটা বাঁশি কম বাজাক। হাঁসগুলো ডিম দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
মামা হেসে বললেন, রেফারির বাঁশি শুনে হাঁসেরও নিয়ম মানা উচিত।
নানাজান মাথা নেড়ে ভেতরে চলে গেলেন। আমি বুঝলাম, কালকের খেলা খুব সাধারণ কিছু হতে যাচ্ছে না। আর গুলজার মামা মাঠে নামলে সাধারণ জিনিস বেশিক্ষণ সাধারণ থাকে না...।
পরের দিন মাঠে পৌঁছেই বুঝলাম, রেফারি হওয়া মোটেই সহজ কাজ না। দুই দলের খেলোয়াড়ই গুলজার মামার চেনা। কেউ ‘গুলজার ভাই’ বলে ডাকছে। কেউ ‘মামা’ বলছে। কেউ আবার বাঁশিটা হাতে নিয়ে দেখতে চাইছে। মামা খুব গম্ভীর। গলায় বাঁশি। হাতে ঘড়ি। মুখে এমন ভাব, যেন বিশ্বকাপের ফাইনাল। খেলা শুরু হওয়ার আগে তিনি দুই দলের ক্যাপ্টেনকে ডেকে বললেন, একটা কথা। সবাই চুপ।
মারামারি করা যাবে না।
দুই ক্যাপ্টেন একসাথে বলল, আচ্ছা।
রাগ করা যাবে না।
আচ্ছা।
আর আমার সাথে তর্ক তো একদম না।
একজন খেলোয়াড় হেসে বলল, আপনি যদি ভুল বাঁশি দেন?
মামা এক মুহূর্ত ভেবে বললেন, তাহলে... ভদ্রভাবে ভুলটা মেনে নিও।
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল। খেলা শুরু হলো। প্রথম পাঁচ মিনিট খুব সুন্দর গেল। মামা এমন দৌড়াচ্ছেন, মনে হচ্ছে তিনিও খেলছেন। হঠাৎ একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিল। দু’জনই একসাথে চিৎকার করল, ফাউল!
মামা তাড়াতাড়ি বাঁশি বাজালেন। তারপর আমার দিকে তাকালেন। আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। আমি কিছুই বুঝিনি। মামা গম্ভীর গলায় বললেন, দু’জনই সাবধানে খেল।
দু’জনই মাথা নেড়ে আবার খেলতে শুরু করল। দর্শকরা বলল, রেফারি খারাপ না!
আমি বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মামা যে আমার সাথে এসেছে! দ্বিতীয়ার্ধে খেলার গতি বেড়ে গেল। একদল আক্রমণ করছে। আরেক দল রক্ষা করছে। হঠাৎ বলটা সজোরে উড়ে এসে সোজা মামার পায়ের সামনে পড়ল। সবাই চিৎকার করল, বল! বল!
আমি ভাবলাম, মামা নিশ্চয়ই সরে যাবেন। কিন্তু ফুটবলপ্রেমী মানুষ কি আর এত সহজে পারে? মামার দুই চোখ চকচক করে উঠল। এক মুহূর্তে যেন তিনি ভুলেই গেলেন, তিনি রেফারি।
ধপাস!
এমন এক শট মারলেন, বলটা বাঁক খেয়ে সোজা জালে। মাঠ এক সেকেন্ড চুপ। তারপর একসাথে সবাই চেঁচিয়ে উঠল, আরে রেফারিই গোল দিয়ে দিলো!
দুই দলের খেলোয়াড় একসাথে মামার দিকে দৌড়ে এলো। মামা তখনও অবাক হয়ে জালের দিকে তাকিয়ে। মুখে ছোট্ট হাসি। বললেন, শটটা কিন্তু খারাপ হয়নি! মাঠজুড়ে হোঁ হোঁ করে হাসি পড়ে গেল। ক্লাবের সভাপতি হাঁসতে হাঁসতে মামার হাত থেকে বাঁশিটা নিলেন। বললেন, গুলজার, আজ থেকে তুমি রেফারি না।
মামার মুখ শুকিয়ে গেল।
তাহলে?
সভাপতি কাঁধে হাত রেখে বললেন, তুমি আমাদের নতুন বলবয়।
মামা অবাক।
বলবয় কেন?
সভাপতি হেসে বললেন, কারণ রেফারি বলে লাথি মারে না। কিন্তু তুমি সুযোগ পেলেই মারো!
বাড়ি ফেরার পথে মামা খুব চুপচাপ।
আমি বললাম, মন খারাপ?
মামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, রেফারি হওয়াটা গেল।
আমি সান্ত¡না দিলাম, আবার হবে।
মামা মাথা নেড়ে বললেন, না রে। আজ একটা জিনিস বুঝলাম।
কী?
আমার সামনে ফুটবল রেখে ‘মারবি না’ এই কথাটা বলা ঠিক, কিন্তু বিশ্বাস করা ঠিক না!
আমি এত জোরে হেসে উঠলাম যে হাঁটতে হাঁটতেই বসে পড়লাম। পেছন থেকে নানাজান সব শুনে বললেন, গাধা, তুই রেফারি হতে যাস কেন? তুই তো জন্মগত স্ট্রাইকার!
মামা এবার একটুও প্রতিবাদ করলেন না। শুধু মুচকি হেসে বললেন, গোলের লোভটা এখনো যায়নি, আব্বা!



