বিশেষ সংবাদদাতা
টেলিকম খাতে করসুবিধা গ্রাহক নয়, পাচ্ছেন অপারেটররা। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোবাইলফোনের সিমের ওপর আরোপিত তিন শ’ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই সুবিধার সুফল সাধারণ গ্রাহক পাবেন না, বরং পুরো সুবিধাই মোবাইল অপারেটরদের কাছে চলে যাবে। এতে সরকার এক হাজার দুই শ’ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বলে মন্তব্য করেছেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। আর ফাহিম মাশরুর বলেন, স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দিতে গিয়ে স্মার্টফোনের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হলে দেশের ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্য বক্তারা বলেন, এনবিআর থেকে ট্যাক্স অব্যাহতি (ট্যাক্স এক্সেম্পশন) সনদ পেতে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) কোম্পানিগুলোকে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিকভাবে ব্যয় করতে হয়।
বুধবার রাজধানীর কাওরানবাজারের বিডিবিএল ভবনে টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্মের (টিআইপিএপি) উদ্যোগে আয়োজিত ‘টেলিকম ও প্রযুক্তি খাতে বাজেটের প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসিসর সাবেক সভাপতি ও টিআইপিএপির আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর। এতে বক্তব্য রাখেন বেসিসর সাবেক পরিচালক ও ড্রিম ৭১ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশাদ কবির ও শেয়ার ট্রিপের সিইও সাদিয়া হক। উপস্থিত ছিলেন বেসিসর সাবেক পরিচালক ও বন্ডস্টাইন টেকনোলজি লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মীর শাহরুখ ইসলাম।
মাহতাব উদ্দিন বলেন, সরকার টেলিকম খাতে একের পর এক করসুবিধা দিলেও তার প্রতিফলন গ্রাহকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং অপারেটরদের মুনাফাই বাড়ছে। তাই নীতিনির্ধারণে গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন সিম বিক্রির ক্ষেত্রে একটি অপারেটরের মোট ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ শ’ থেকে সাড়ে পাঁচ শ’ টাকা। এর মধ্যে শুধু সিম ট্যাক্সই ছিল তিন শ’ টাকা। বাকি অর্থ বিতরণ ব্যয়, খুচরা বিক্রেতার কমিশনসহ অন্যান্য খাতে খরচ হয়। তিনি বলেন, সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের ফলে অপারেটরদের প্রতি সিমে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমে যাবে, যা সরাসরি তাদের আর্থিক সাশ্রয়ে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, আমি সিম ট্যাক্স প্রত্যাহারের বিরোধিতা করছি না। এটি ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই ১২শ’ কোটি টাকার সুবিধা যদি গ্রাহকদের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্ক (এসডি) কমানোর মাধ্যমে দেয়া হতো, তাহলে দেশের মানুষ সরাসরি উপকৃত হতো। তার মতে, বর্তমানে একজন গ্রাহক মোবাইল অপারেটরকে এক শ’ টাকা পরিশোধ করলে তার মধ্যে প্রায় ৩৯ টাকাই বিভিন্ন কর হিসেবে সরকারের কাছে যায়। অর্থাৎ টেলিকম খাতে সবচেয়ে বড় করদাতা আসলে গ্রাহক। অথচ এবারের বাজেটে গ্রাহকদের জন্য কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা রাখা হয়নি। তিনি বলেন, বাজেটে অপারেটরদের জন্য রাজস্ব ভাগাভাগির ওপর ২ দশমিক ৫ শতাংশ উইথহোল্ডিং ট্যাক্স তুলে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া নেটওয়ার্ক সেবার ওপর কর ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এসব সুবিধা শেষ পর্যন্ত অপারেটরদের মুনাফাই বাড়াবে।
মাহতাব উদ্দিনের দাবি, টেলিকম খাতে মোট করের প্রায় ৭০ শতাংশই শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের পকেট থেকে আসে। নতুন বাজেট কার্যকর হওয়ার পর এই হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোবাইল ডাটার ক্রয়ক্ষমতা বা অ্যাফোর্ডেবিলিটির দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। তাই গ্রাহকের করের বোঝা কমানোই হওয়া উচিত ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে মাহতাব উদ্দিন বলেন, এসি কক্ষে বসে জনগণের সমস্যা বোঝা সম্ভব নয়। মাঠে গিয়ে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে হবে। তাহলেই কার্যকর ও জনবান্ধব নীতি তৈরি করা সম্ভব হবে। স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে সরকারের পদক্ষেপ ইতিবাচক। তবে ফিচার ফোন ও স্মার্টফোনকে একইভাবে বিবেচনা না করে স্মার্টফোনে আরো বেশি করসুবিধা দেয়া উচিত ছিল। কারণ স্মার্টফোনই ফিনটেক, এডুটেক এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।
মূল প্রবন্ধে ফাহিম মাশরুর বলেন, বর্তমানে অনেক মানুষের জন্য স্মার্টফোনই প্রধান কম্পিউটিং ডিভাইস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ক্লাউডভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে স্মার্টফোন দিয়েই এখন অফিসের কাজ, ডকুমেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে নানা ধরনের উৎপাদনশীল কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। তাই স্মার্টফোনের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।
স্টার্টআপ খাত প্রসঙ্গে ফাহিম মাশরুর বলেন, বাজেটে স্টার্টআপের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও করসুবিধা ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাস্তবে এসব সুবিধা কতজন উদ্যোক্তা পাবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই স্টার্টআপের জন্য যে সুবিধাগুলো দেয়া হচ্ছে, সেগুলো যেন প্রকৃত এবং নতুন উদ্যোক্তারাই পান। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।
রাশাদ কবীর বলেন, এনবিআর থেকে ট্যাক্স অব্যাহতি (ট্যাক্স এক্সেম্পশন) সনদ পেতে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) কোম্পানিগুলোকে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিকভাবে ব্যয় করতে হয়। এটি সংশ্লিষ্ট খাতে একটি ‘ওপেন সিক্রেট’। তিনি বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সফটওয়্যার শিল্প কর অব্যাহতি সুবিধাপ্রাপ্ত খাত। কিন্তু বাস্তবে সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বড় ব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানি বিল পরিশোধের আগে এনবিআরের ট্যাক্স এক্সেম্পশন সনদ চায়। তার অভিযোগ, এই সনদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানকে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অনৈতিকভাবে খরচ করতে হয়।



