কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বাণিজ্য, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও সামরিক-প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা জোরদার করতে চায় রাশিয়া। গতকাল সোমবার মস্কোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানে সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এ কথা জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তিন দিনের সফরে রাশিয়া গেছেন। জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এটি প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর।
সের্গেই লাভরভ বলেন, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই আপনাকে এবং আপনার প্রতিনিধিদলকে মস্কোতে স্বাগত জানাতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমরা আপনাকে ‘মাননীয় মন্ত্রী’ এবং ‘মাননীয় সভাপতি’ উভয় নামেই সম্বোধন করতে পারছি। সাধারণ পরিষদকে আরো কার্যকর করে তোলার এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার আপনার অভিপ্রায়কে আমরা স্বাগত জানাই। জাতিসঙ্ঘের কাজ করার ক্ষেত্রে আপনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের অর্থবহ ফলাফলের প্রত্যাশা করছি।
তিনি বলেন, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ভবিষ্যৎ সভাপতি হিসেবে আপনি অনিবার্যভাবে সমস্ত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করবেন। বিশ্বজুড়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ ও জটিল হয়ে উঠছে, যার জন্য কূটনৈতিক দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার প্রয়োজন। আমাদের পক্ষ থেকে এই প্রচেষ্টায় আপনাকে সমর্থন করার জন্য আমরা সম্ভাব্য সব কিছু করব। আপনার এই সফরকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী।
লাভরভ বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ইতিহাস রয়েছে, যা ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ৫৫তম বার্ষিকীতে পদার্পণ করবে। আমরা আসন্ন এই বার্ষিকীটি কিছু সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে উদযাপন করতে চাই।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের নির্বাচনে সমর্থন দেয়ার জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জটিল একটি বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আমরা সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রবেশ করতে যাচ্ছি। বিশ্ব শান্তিতে নেই। উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা চ্যালেঞ্জের মুখে আছি। এই অবস্থায় সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বটা সহজ হবে না।
রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক আরো জোরদারে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুুক্তিযুদ্ধে যে অল্প কয়েকটি দেশ আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল, রাশিয়া তার অন্যতম। এ সময়ে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধটা ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারত। স্বাধীনতার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করতে সহায়তা করেছিল। এই অপারেশনে একজন রাশিয়ান নিহতও হয়েছিলেন।
খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমানে আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সামরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত খাতে সম্প্রসারিত। বাংলাদেশে আপনাদের চমৎকার একজন রাষ্ট্রদূত রয়েছে, যিনি আমাদের সম্পর্ককে এগিতে নিতে সক্রিয়। রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের সহযোগিতার অন্যতম একটি নিদর্শন, যা শিগগিরই অপারেশনে যাবে বলে আমরা আশা করছি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠক সম্পর্কে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন ড. খলিলুর রহমান। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, আমাদের দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে চলছে। উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগসহ বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অংশীদার। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ এগিয়ে চলেছে। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা ও বহুপক্ষীয় কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ নিয়মিতভাবে ২০০ কোটি ডলারের বেশি রয়েছে। রাশিয়া বাংলাদেশে প্রধানত শিল্প সরঞ্জাম, সার ও গম রফতানি করে। অপর দিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ও সামুদ্রিক খাদ্য আমদানি করে।
বিবৃতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে দুই দেশের সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, গত ২৮ এপ্রিল প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট চালু হয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটও চলতি বছরের মধ্যেই উৎপাদনে আসতে পারে। কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে তা বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।
রাশিয়া শিক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে উল্লেখ করে এতে বলা হয়, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে রাশিয়ার ফেডারেল বৃত্তি কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ১৮৫টি বৃত্তি বরাদ্দ করা হয়েছে।



