দেশের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করার ঘোষণা এসেছে নতুন বাজেটে। অর্থমন্ত্রীর দেয়া নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী সরকার এবার সুবিধাভোগীর মোট সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পাশাপাশি মাসিক ভাতার পরিমাণও বৃদ্ধির বড় পরিকল্পনা নিয়েছে। এই কল্যাণমুখী মানবিক সিদ্ধান্তের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রামীণ ও শহরের নি¤œ আয়ের লাখো পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর মানবিক রাষ্ট্র গঠনে প্রস্তাবিত বাজেটকে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছে বিএনপি সরকার। তারা বলছে, এই বাজেট নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের একটি আর্থিক রূপরেখা।
সূত্র মতে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার সামনে রেখেই প্রস্তাবিত বাজেট সাজিয়েছে বিএনপি সরকার। মূলত দলের নির্বাচনী ইশতেহারের কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয়ের নেয়া কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগই দেখা গেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেটে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপ এবং দীর্ঘদিনের নানা সঙ্কটে যখন বিপর্যস্ত অর্থনীতি, সেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জনতুষ্টির বাজেট প্রস্তাব করেছে সরকার। অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ এবং কাজের সুযোগ বা কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকারের প্রথম বাজেট প্রস্তাবে নতুনত্ব আছে। রাজনীতিক অঙ্গীকার থাকলেও লম্বা সময়ের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেট ঘোষণায়।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, নি¤œ আয়ের মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বস্তি দিতে ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্তত আট ধরনের নতুন কর্মসূচি যুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তায় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৫.৩৯% এবং মোট জিডিপির ২.১১%। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে এই বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৪.৪% বেশি। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও আওতা বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু নতুন ছয়টি কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় এক কোটি নতুন সুবিধাভোগী অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, যার আওতায় ৪১ লাখ প্রান্তিক নারী প্রতি মাসে আড়াই হাজার (২,৫০০) টাকা করে পাবেন। বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ৬১ লাখ থেকে বেড়ে ৬২ লাখে উন্নীত হয়েছে এবং মাসিক ভাতার পরিমাণ ৬৫ টাকা বেড়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৪২.৫ লাখ কৃষক সহায়তা পাবেন। কৃষক কার্ড ও কৃষি খাতে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যার ফলে সারা দেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন কৃষক উপকৃত হবেন।
কার্যকারিতা বাড়াতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা ৯৫ থেকে কমিয়ে ৯০টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে, যেখানে তারা প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করে পাবেন। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতাও বাড়িয়ে এক লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি আড়াই লাখ ধর্মীয় নেতাকে (ইমাম-মুয়াজ্জিন) এই নিরাপত্তা জালের আওতায় বিশেষ সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য বিনামূল্যে ট্রেন ভ্রমণ এবং মেট্রোরেলে ২৫% ডিসকাউন্টের সুবিধা চালু করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ক্যান্সারসহ ছয়টি মারাত্মক ব্যাধির এককালীন অনুদান ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদিও সব প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এক অর্থবছরে সম্ভব নয়, তবুও সরকারের নীতিগত অবস্থান স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাত সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি সংযোজন, হাসপাতাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সরকার বিশ্বাস করে, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য মানবসম্পদ উন্নয়নের বিকল্প নেই। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ, সেচসুবিধা উন্নয়ন এবং কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। চাল, ডাল, চিনি, ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেলসহ ষাটটি নিত্যপণ্যের ওপর কর ছাড় দেয়া হয়েছে। এসব পণ্যের ওপর এক থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত উৎসে কর আছে। সেটি কমিয়ে একই হারে দশমিক পাঁচ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, রাজনৈতিক সরকার তাদের রাজনৈতিক চিন্তা থেকে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই এই বাজেট দেয়ার কথা বলেছে। এখন দেশের ব্যাংকখাতসহ অর্থনীতি স্বাভাবিক করে এর বাস্তবায়ন এলেই বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতা ও বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি এর বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে নয়া দিগন্তকে বলেছেন, রাজস্ব আদায় ঠিকমতো না হলে এই সামাজিক সুরক্ষা খাতের টাকা শেষ পর্যন্ত ঘাটতি অর্থায়নের কবলে পড়তে পারে। এ ছাড়া প্রকৃত দরিদ্ররা যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কার্ড পায়, তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বাজেট পরবর্তী পর্যালোচনায় উল্লেখ করেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার এই বরাদ্দ আপাতদৃষ্টিতে বিশাল মনে হলেও এর ভেতরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রের সুদ এবং বিভিন্ন খাতের ঋণও অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক দরিদ্ররা যে সরাসরি নগদ সহায়তা পায়, তার অনুপাত জিডিপির এক শতাংশের কাছাকাছি। তবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ এর মাধ্যমে সরাসরি দরিদ্র নারীদের মাসে ২৫০০ টাকা দেয়ার প্রস্তাবটি একটি প্রশংসনীয় সাহসী পদক্ষেপ। তিনি দ্রুত ডাটাবেজ আধুনিকায়নের দাবি জানান।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতের বরাদ্দ এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ইতিবাচক। সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণের দরকার আছে। সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট উৎপাদন-বিনিয়োগ-ব্যবসাবান্ধব একটি সৃজনশীল বাজেট। সব শ্রেণীর মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এই ধরনের বাজেট আমরা আগে কখনো দেখিনি। এখানে ফ্যামিলি কার্ডটা একটা বিশাল ব্যাপার। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ পরিবার প্রধান মহিলাদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেয়া হবে। একইভাবে কৃষক কার্ড করা হয়েছে, মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রতি মাসে সম্মানী প্রদান করা হবে। বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে আইনের সংস্কার ও সহজীকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই বাজেট নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটা যুগান্তকারী বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
এ দিকে বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা দূর করতে সরকারকে তিনটি বিষয়ে নজর দেয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে প্রথমত কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা। দ্বিতীয়ত. শতভাগ ভাতা যাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর হাতে যায় তা নিশ্চিত করা এবং তৃতীয়ত সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি যদি চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তবে এই নগদ অর্থ সহায়তার প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। সরকার যদি সফলভাবে এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে এটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে।



