অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বড় ধরনের সংশোধনের পর ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। গতকাল মঙ্গলবার দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সবগুলো সূচকের উন্নতি ঘটে। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে লেনদেনের শুরু থেকেই দিনের সূচকের আচরণ ছিল সাবলীল। মাঝখানে স্বল্প সময়ের জন্য মৃদু বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলেও শেষ দিকে এসে তা সামলে নেয় বাজারগুলো। সূচকের বড় উন্নতি ধরে রেখেই লেনদেন শেষ করে দুই বাজার। একই সময় বৃদ্ধি পায় বাজারগুলোর লেনদেনও।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন এ মুহূর্তে বাজার যে ধরনের আচরণ দেখা যাচ্ছে তা স্বাভাবিক। সংশোধনের ফলে পুঁজিবাজার নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই কোন কোন সময় বাজারগুলো নেতিবাচক আচরণ করলেও পুনরায় ইতিবাচক ধারায় ফিরে। তাই বিনিয়োগকারীদের নেতিবাচক আচরণ দেখা গেলেও অস্থির হয়ে হুটহাট শেয়ার বিক্রি না করে বাজার পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এতে বড় ধরনের লোকসান এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
দেশের প্রধান পুঁজিবাাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল সবগুলো সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটে। বাজারটির প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪১ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ৫ হাজার ৬৫৭ দশমিক ৬২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৮৯৮ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১১ দশমিক ১৬ ও ৬ দশমিক ৭৩২ পয়েন্ট। একইভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক গতকাল ৬০ দশমিক ২৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ১৫ ও ৩৭ দশমিক ৩২ পয়েন্ট।
এ দিকে পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ বা মার্জিন ফাইন্যান্সিং কার্যক্রমকে আরো সুশৃঙ্খল, ঝুঁকিনিয়ন্ত্রিত এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষাবান্ধব করতে বিদ্যমান বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) বিধিমালা, ২০২৫’-এর সংশোধিত খসড়া প্রকাশ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অংশীজনদের মতামত ও পরামর্শের জন্য কমিশন ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে অংশীজনদের এ ব্যাপারে মতামত ও পরামর্শ দেয়ার অনুরোধ করেছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
খসড়া এই বিধিমালায় মার্জিন অর্থায়নের সংজ্ঞা, কারা মার্জিন ঋণ দিতে পারবে, গ্রাহকের ন্যূনতম বিনিয়োগ, মার্জিনের সীমা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মার্জিন কল, বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি, মার্জিনযোগ্য শেয়ার নির্বাচন, একক শেয়ারে বিনিয়োগের সীমাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন বিধান সংযোজন ও সংশোধনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি হলো কোনো বিনিয়োগকারীর ইকুইটি যদি মার্জিন ঋণের ৫০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই হিসাবের প্রয়োজনীয় সংখ্যক শেয়ার বিক্রি করতে পারবে। খসড়া বিধিমালার ওপর অংশীজন, বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত, পরামর্শ এবং আপত্তি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে কমিশনের কাছে জমা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএসইসি। কমিশন জানিয়েছে, প্রাপ্ত মতামত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জনের পর বিধিমালার চূড়ান্ত সংস্করণ প্রস্তুত করা হবে। পরে সরকারি গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে এটি কার্যকর করা হবে।
একই সাথে বিএসইসি স্পষ্ট করেছে, বর্তমানে প্রকাশিত নথিটি কেবল একটি খসড়া প্রস্তাব। এটি কোনো চূড়ান্ত সংশোধনী নয়। তাই এ খসড়া নিয়ে অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা, অপপ্রচার বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মার্জিন অর্থায়নের নতুন সংজ্ঞা: খসড়া অনুযায়ী, গ্রাহকের মার্জিন হিসাবে জমা রাখা মার্জিনের বিপরীতে সিকিউরিটি কেনার জন্য মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান যে অর্থ প্রদান করবে এবং ওই অর্থের ওপর অর্জিত সুদ বা মুনাফাকে মার্জিন অর্থায়ন হিসেবে গণ্য করা হবে। শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়নের ক্ষেত্রে ‘মুনাফা’ বলতে শরিয়াহসম্মত লাভকে বোঝানো হয়েছে। একই সাথে কমিশনের নিবন্ধিত বাজার মধ্যস্থতাকারীদের ‘মার্জিন অর্থায়নকারী’ হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
পৃথক ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক: মার্জিন অর্থায়ন পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নামে পৃথক ব্যাংক হিসাব রাখতে হবে। এ হিসাব শুধুমাত্র মার্জিন অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট হিসাব নিষ্পত্তির কাজে ব্যবহার করা যাবে। কোনো শাখা বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের হিসাব খোলা যাবে না। বর্তমানে এ ধরনের হিসাব থাকলে বিধিমালা কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া তা পরিচালনা করা যাবে না।
মার্জিন চুক্তির মেয়াদ এক বছর: খসড়ায় মার্জিন চুক্তির মেয়াদ এক বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পক্ষ চুক্তি বাতিল না করলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে। এ ছাড়া গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনায় নিজস্ব নীতিমালার আওতায় প্রতিষ্ঠান মার্জিন অর্থায়ন দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দু’টি হিসাব পরিচালনা করতে হবে। একটি নগদ হিসাবও একটি মার্জিন হিসাব। আর এ ক্ষেত্রে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে এক বছরের জন্য একটি চুক্তি হবে।
ইকুইটির বেশি ঋণ দেয়া যাবে না : কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের ইকুইটির চেয়ে বেশি মার্জিন অর্থায়ন দেয়া যাবে না। অর্থাৎ গ্রাহকের ইকুইটি ও মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ অনুপাত হবে ১:১। তা ছাড়া তালিকাভুক্ত জীবন বীমা কোম্পানির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে এ অনুপাত সর্বোচ্চ ১:০.২৫ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মার্জিন অর্থায়নের অর্থ কেবল মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটি কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে।
মূলধনের পাঁচ গুণ পর্যন্ত মার্জিন ঋণ: কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী তার প্রকৃত মূলধন (কোর ক্যাপিটাল) অথবা নিট সম্পদের (যেটি বেশি) পাঁচ গুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না। প্রত্যেক মার্জিন অর্থায়নকারীকে অন্তত দুই সদস্যবিশিষ্ট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটিকে বছরে কমপক্ষে চারটি সভা করতে হবে এবং সভার কার্যবিবরণী পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা কোনোভাবেই কমিশনের বিধিমালার তুলনায় শিথিল হতে পারবে না।
মার্জিন ঋণের জন্য গ্রাহকের হিসাবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিতে অন্তত তিন লাখ টাকার বিনিয়োগ থাকতে হবে। এ ছাড়া গ্রাহক নিজস্ব অর্থে মার্জিন-অযোগ্য শেয়ার কিনলেও সেগুলো মার্জিন হিসাবের ইকুইটির অংশ হিসেবে গণ্য হবে না। খসড়া অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির মূল্য-আয় (পি/ই) অনুপাত ৩০-এর বেশি হলে অথবা কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক হলে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন দেয়া যাবে না।



