মুনাফা তোলার জেরে যথারীতি সংশোধন পুঁজিবাজারে

নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা পেল দুই স্টক এক্সচেঞ্জ

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের বড় উন্নতির পর যথারীতি সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। গত ৩০ জুন লেনদেন ও সূচকের রেকর্ড গড়ার পর গতকাল ফের সংশোধনের শিকার হয়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। মঙ্গলবার দুই পুঁজিবাজারের সূচক সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায়। ঢাকায় লেনদেনও পৌঁছে ২১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে। এর ফলে বাজারে মূল্যস্তরের যে উন্নতি ঘটে তা থেকে মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে সৃষ্ট বিক্রয়চাপ এ সংশোধন ঘটায়। এতে উভয় পুঁজিবাজারেই সূচকের অবনতির পাশাপাশি লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির বেশির ভাগই দরপতনের শিকার হয়।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এভাবেই বাজার স্বাভাবিক সংশোধনের ভেতর দিয়েই একসময় টেকসই রূপ নেবে। বিনিয়োগকারীরা যখনই তাদের বিনিয়োগের বিপরীতে কমবেশি মুনাফা আয় করার সুযোগ পাবেন তখন তারা নতুন করে বিনিয়োগে উৎসাহ পাবেন। আর এর ফলে বাজারে যুক্ত হবেন নতুন নতুন বিনিয়োগকারী। আর পুঁজিবাজারগুলো স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে পারলে ভালো ভালো কোম্পানিগুলোও তালিকাভুক্তিতে আগ্রহ দেখাবে। গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্প্রসারিত হবে পুঁজিবাজার, যা একপর্যায়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করবে।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি গতকাল ১৮ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। এ দিন সকালে ৫ হাজার ৭৬২ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৭৪৩ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৩৬ ও ১ দশমিক ৮০ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৪৪ দশমিক ০১ পয়েন্ট হারায় গতকাল। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১২৯ দশমিক ৩২ ও ২৩ দশমিক ১৯ পয়েন্ট।

ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় ডিএসইর প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটে ২৫ পয়েন্টের বেশি। তবে প্রথমদিকের এ চাপ দ্রুত সামলে নেয় বাজারটি। সকাল সাড়ে ১০টার ডিএসই সূচক ফের পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৭৭৪ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকটির ১২ পয়েন্ট উন্নতি রেকর্ড করা হয়। লেনদেনের এ পর্যায়ে আবার বড় ধরনের বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে বেলা ১২টায় সূচকটি নেমে আসে দিনের সর্বনিম্ন ৫ হাজার ৬৩৪ পয়েন্টে। দিনের বাকি সময় সূচকটি আরো বেশ ক’বার ওঠানামা শেষে ৫ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে স্থির হয়। অনেকটা একই ধরনের আচরণ ছিল সিএসইর প্রধান সূচকটিরও।

দিনের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গতকাল ব্যাংকিং খাতেই মূলত সংশোধন ঘটে বেশি। এ খাতের ৮০ শতাংশ কোম্পানির দরপতন ঘটে। অন্য দিকে বীমা, টেক্সটাইল ও সেবা খাতের বেশ কিছু কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, যা দিনের সূচকের বড় পতন রোধ করে। বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর ৮০ শতাংশই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে। এর আগে গত মঙ্গলবার ব্যাংকিং খাতে মূল্যবৃদ্ধি ছিল প্রায় শতভাগ কোম্পানির। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের ভালো কোম্পানিগুলো সামনের দিনগুলোতে আরো ভালো অবস্থানে পৌঁছার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তা ঘটবে যথারীতি সংশোধন ঘটার মাধ্যমে। তা ছাড়া মূলধন বেশি হওয়ায় ব্যাংকিং কোম্পানি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভ তুলে নিতে তৎপর থাকেন।

এ দিকে দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজারে দৈনন্দিন কার্যক্রম ও এর নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অত্যধিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত হচ্ছে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ। বাজারের গতিপ্রকৃতি ও লেনদেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা মোতাবেক এখন থেকে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ নিজস্ব সার্কিট ব্রেকার (শেয়ারের দর ওঠানামার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সীমা) ও বাজার নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য মাপকাঠি (মার্কেট কন্ট্রোল প্যারামিটার) স্বাধীনভাবে নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারবে। গত মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের সভাপতিত্বে ১০১৮তম জরুরি কমিশন উক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। গতকাল প্রতিষ্ঠানটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা মোতাবেক সার্কিট-ব্রেকার সীমাসহ বাজার নিয়ন্ত্রণের মাপকাঠি (মার্কেট কন্ট্রোল প্যারামিটারস) নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের এখতিয়ার থাকায়, প্রযোজ্য প্রবিধানমালা, নীতিমালা (পলিসি) ও কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা (অপারেশনাল রিকোয়ারমেন্টস) অনুযায়ী উক্ত মাপকাঠি স্বাধীনভাবে নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের জন্য স্টক এক্সচেঞ্জদ্বয়কে নির্দেশনা প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জুন, ২০২১ তারিখে ইস্যুকৃত কমিশনের অর্ডার নম্বর বিএসইসি/সার্ভেইল্যান্স/২০২০-৯৭৫/২১৯ বাতিল (রিপিল) করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রসঙ্গত, এর আগে বিগত কমিশন নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশকে চূড়ান্ত বিবেচনায় (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া) নেয়ার সিদ্ধান্ত প্রদান করে।

এ দিকে গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি মালেক স্পিনিং মিলস। ৬৭ কোটি এক লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ৭৩ লাখ ৭১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৬০ কোটি ৪৬ লাখ টাকায় ৯৪ লাখ ৪৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকিং কোম্পানি ব্র্যাক ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।

লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, আইপিডিসি, সিটি ব্যাংক, আইটি কনসালট্যান্ট, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও সোনারগাঁও টেক্সটাইলস।