সংসদে প্রশ্নোত্তরে অর্থমন্ত্রী

বাজেটে স্টার্টআপে ৪০০ কোটি টাকার প্রণোদনা

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্টার্টআপ, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আরো বলেন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরছে এবং বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। অন্য দিকে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আস্থা পুনরুদ্ধারে পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনসহ একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় দিনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশনে ঢাকা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্টার্টআপ তহবিল, নারী উদ্যোক্তা এবং তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ কারণে নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগের সুযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

একই প্রশ্নের আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্টার্টআপ তহবিলের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী বাজেটে এ খাতে আরো বড় পরিসরে সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে।

সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে তরুণদের জন্য বিনা সুদের কোনো ঋণ প্রকল্প না থাকলেও সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিচালিত পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। আর জামানত সাপেক্ষে ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একই সাথে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ নামে আরো ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যেখান থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। শুধু ঋণ নয়, স্টার্টআপ খাতে ইক্যুইটি বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ৩৯টি তফসিলি ব্যাংকের অংশীদারিত্বে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্ভাবনাময় উদ্যোগগুলো ইক্যুইটি সহায়তা পাবে।

ডলার পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ

সংসদ সদস্য মো: আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ডলার সঙ্কট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা না গেলেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের ফলে বৈদেশিক লেনদেনে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, রফতানি আয় সম্প্রসারণ, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে অর্থায়ন নিয়ে আলোচনার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমদানি নিয়ন্ত্রণই সরকারের একমাত্র কৌশল নয়। বৈধ পথে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখীকরণ, দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিনিময় হারকে আরো বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। একই সাথে উৎপাদন, কৃষি, জ্বালানি ও রফতানি খাতের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কার

কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুসংগঠিত রেজল্যুশন কাঠামো গড়ে তুলেছে। তিনি জানান, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’-এর আওতায় পাঁচটি সমস্যাপীড়িত ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে। একই সাথে ‘আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬’-এর মাধ্যমে সুরক্ষিত আমানতের সীমা এক লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। আগে ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরা এই সুবিধার বাইরে থাকলেও এখন তারাও এর আওতায় এসেছেন।

খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া, খেলাপিদের তালিকা প্রকাশ, একজন গ্রাহকের ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ দ্রুত আদায়ের জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (এডিআর), অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের জন্য প্রণোদনা নীতিমালা হালনাগাদের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের সমন্বিত উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করবে এবং বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিড়ির কর বাড়ছে না

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিড়ির মূল্য ও করহার অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। ফলে নতুন অর্থবছরে বিড়ির দাম বাড়ছে না। বিড়ির ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), এক শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ এবং প্রচলিত কর কাঠামো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সে কারণে আগামী অর্থবছরে বিড়ির মূল্য বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা নেই।