ইরান-ইসরাইল ফের পাল্টাপাল্টি হামলা, ট্রাম্পের আহ্বানে স্থগিত

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভেঙে পড়েছে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দুই মাসের নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি। আবারো উত্তেজনায় ফুঁসছে মধ্যপ্রাচ্য। রোববার রাতে উত্তর ইসরাইলের দিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে হামলা চালায় ইরান। জবাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পশ্চিম ও মধ্য ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরাইল।

আলজাজিরা ও ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইলের খবরে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি আরো বিস্ফোরক হয়ে ওঠার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষকে সংযম দেখানোর আহ্বান জানান এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।

ট্রাম্পের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইরান ও ইসরাইল পৃথকভাবে হামলা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

লেবাননে ইসরাইলের হামলাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল আখ্যায়িত করে উত্তর ইসরাইলের দিকে একঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, এটি তাদের ধারাবাহিক হামলা অভিযানের সূচনা। ইরান জানিয়েছে, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়েহ উপশহরে হিজবুল্লাহর সদর দফতর লক্ষ্য করে ইসরাইলের চালানো হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০টার দিকে উত্তর ইসরাইলের দিকে দ্রুত ধারাবাহিকভাবে প্রায় ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। হামলায় কোনো ইসরাইলি আহত হয়নি।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে এটিকে একটি ‘সতর্কবার্তা’ বলে উল্লেখ করে। বাহিনীটি দাবি করে, যদি আবারো ইরানের বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আঞ্চলিক সব লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্র করে আরো ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।

এ দিকে এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পর ইসরাইলি প্রতিরক্ষাবাহিনী (আইডিএফ) ঘোষণা দেয়, তাদের বিমানবাহিনী পশ্চিম ও মধ্য ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এর পরপরই ইরানের রাজধানী তেহরান, তাবরিজ ও ইসফাহানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবর প্রকাশ করে স্থানীয় ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। আইআরজিসির দাবি, ইসরাইল আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়েছে। ইরানি বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, প্রায় ১৫টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। আলজাজিরার এক খবরে বলা হয়েছে, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে তেহরানের একটি ড্রোন সংরক্ষণাগার ছিল। কিছু খবরে মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরাইলের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির হামলার পর বলেন, তেহরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ইসরাইল প্রস্তুত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে। সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত বিবৃতিতে জামির বলেন, ‘সবুজ সঙ্কেত পাওয়া মাত্রই আইডিএফ শক্তিশালীভাবে শত্রুর ওপর আঘাত হানবে।’

এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ইসরাইলের চ্যানেল ১২-কে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেউ আহত হয়নি এবং পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলার প্রয়োজন নেই।

ট্রাম্প বলেন, ‘আশা করি ইসরাইল প্রতিশোধ নেবে না। যদি বিবি (নেতানিয়াহু) পাল্টা হামলা চালান, তাহলে এটি গত ৪৭ বছর কিংবা গত তিন হাজার বছরের মতোই চলতে থাকবে।’ তিনি আরো জানান, তিনি নেতানিয়াহুকে ফোন করে সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলা না চালানোর অনুরোধ করবেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘উভয় পক্ষই নিজেদেরটা করেছে। ইসরাইল তার হামলা চালিয়েছে, ইরানও তার হামলা চালিয়েছে। আরেকটি হামলার প্রয়োজন নেই। আমি আজ রাতে আর কোনো অতিরিক্ত হামলা দেখতে চাই না।’

হিব্রু ভাষার বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সংক্ষিপ্ত একটি ফোনালাপ হয়েছে। এরপর নেতানিয়াহু শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আনুষ্ঠানিক কোনো বিবরণ প্রকাশ করেনি।

ট্রাম্প দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শুরু করা যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে ইরানের সাথে একটি চূড়ান্ত সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে ওয়াশিংটন। নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা হামলা সেই অগ্রগতিকে নষ্ট করে দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন। ফক্স নিউজকে দেয়া পৃথক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের সাম্প্রতিক হামলা তেহরানের সাথে চলমান আলোচনার জন্য মোটেও সহায়ক হবে না।

সোমবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিতের ঘোষণা দেয় ইরানের সামরিক কমান্ড। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড খাতামুল আম্বিয়া এক বিবৃতিতে জানায়, ইরান ইসরাইলকে ‘কঠিন জবাব’ দিয়েছে। সেই অনুযায়ী, সশস্ত্রবাহিনীর অভিযান আপাতত এখানেই স্থগিত করার ঘোষণা দেয়া হলো। বিবৃতিতে তেহরান সতর্ক করে বলেছে, ‘দক্ষিণ লেবাননসহ অন্যান্য অঞ্চলে যদি আবারো কোনো ধরনের আগ্রাসন চালানো হয়, তবে আগের চেয়েও অনেক বেশি কঠোর ও বিধ্বংসী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

জ্বালানি স্থাপনায় নতুন করে হামলা হলে ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা তার মিত্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট সব তেল, গ্যাস এবং পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় হামলা চালানো হবে বলে হুমকি দেয় ইরান। সোমবার নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ফারস নিউজের এক খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত থাকলে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট তেল ও গ্যাস স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করবে ইরানি সশস্ত্রবাহিনী। সূত্র বলছে, ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের অংশীদারত্ব রয়েছে, এমন যেকোনো তেল কিংবা জ্বালানি কোম্পানিকে বৈধ নিশানা হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

উল্লেখ্য, এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। ওই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা সঙ্ঘাত সাময়িকভাবে থেমে গেলেও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে লড়াই বন্ধ হয়নি। লেবানন ফ্রন্টে সঙ্ঘাত চলতে থাকায় ইরানও বারবার বলে এসেছে, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চাইলে সেই সমাধানে লেবাননের পরিস্থিতিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা আঘাতের ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সঙ্ঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলেও আপাতত যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে।

ট্রাম্পের অনুরোধে তেলআবিব তেহরানের ওপর নতুন কোনো বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও ইসরাইলি এক কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ যদি ইসরাইলের বিভিন্ন শহর লক্ষ্য করে রকেট ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ইসরাইলি বিমানবাহিনী লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে আবারো হামলা শুরু করবে।

চ্যানেল ১২-এর ওই খবরে আরো বলা হয়েছে, ইরানে হামলা স্থগিত করা হলেও ভবিষ্যতে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান পূর্ণ শক্তিতে অব্যাহত থাকবে। তবে এই রিপোর্টের সত্যতা এখনো স্বাধীন কোনো সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করতে পারেনি আলজাজিরা।