বৃহস্পতিবার আইডিবির সাথে ঋণচুক্তি

বাস্তবায়নের পথে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম

অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট। ২০০৮ সালে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ ডিপিপি প্রণয়ন করা হলেও দীর্ঘ সময় কার্যকর উদ্যোগ ছিল না এই প্রকল্পের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েই প্রকল্পটির একনেক অনুমোদন এবং প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার দায়িত্বগ্রহণের পরপরই গত মে মাসে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের জন্য আগ্রহপত্র (ইওআই) আহ্বান করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি। তবে জিওবি ফান্ডে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও দেশের ডলার সঙ্কটকে সামনে রেখে প্রকল্পটি বৈদেশিক ঋণেই বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে আগামী বৃহস্পতিবার ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সাথে সরকারের ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার (১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলার) ঋণচুক্তি হতে যাচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

ইআরএল সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতাধীন বিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির (ইআরপিএলসি) পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’ শীর্ষক প্রকল্পটি গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত হয় এবং চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দুই দিন আগে প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের আমলে গত মে মাসে প্রকল্পটির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের আগ্রহপত্র আহ্বান করা হয়। এরই মধ্যে পরামর্শক চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসেই পরামর্শক নিয়োগ চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট (পিএমসি) ওই প্রকল্পের সামগ্রিক বিষয়াদি তদারকির দায়িত্বে থাকবে। সূত্র মতে, মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) প্রকল্পের যোগ্য বিবেচিত পিএমসি প্রতিষ্ঠানটিকে এই প্রকল্পের ভৌত নির্মাণকাজের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কাজের মান ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কাজের সিডিউল নির্ধারণ, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণসহ সার্বিক নির্মাণকাজ তদারকি করবেন। এ ছাড়া সব ধরনের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ যাবতীয় ক্রয় কার্যক্রম তদারকি করতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের মোট অনুমোদিত ব্যয় ৩১ হাজার কোটি ৫৭ লাখ টাকার মধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থায়ন তথা ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা বাংলাদেশ সরকার-জিওবি এবং ৪০ শতাংশ তথা ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা অর্থায়ন করা হবে বিপিসির নিজস্ব তহবিল হতে জোগান দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশে ডলারের সঙ্কট থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ কমাতে সরকার প্রকল্প অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণের দ্বারস্থ হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ মেট্রিক টন। তন্মধ্যে ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেল ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধন করা হয়। দেশের একমাত্র এই জ্বালানি তেল পরিশোধনাগারটি চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত (ক্রুড অয়েল) তেলের মূল্য কম হলেও ১৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন রিফাইনারি না থাকায় অবশিষ্ট ৫৫ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি মূল্যে আমদানি করতে হয়।

মূলত বাংলাদেশে রিফাইনারি বা পরিশোধন কারখানার সক্ষমতা কম থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম কমে গেলেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ক্রুড অয়েল ক্রয় করে মজুদ করা সম্ভব হয় না। ফলে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব সরাসরি স্থানীয় বাজারে অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ হামলার পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের যে সঙ্কট তা বাংলাদেশে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি তেল কিনে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট সময়মতো বাস্তবায়ন করা হলে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো না বাংলাদেশকে এমন মত জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের।

বিপিসি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় তা পরিশোধন করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হলে এ খাতে একদিকে যেমন আমদানি বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, অপর দিকে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে। সূত্র জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েল আমদানিতে প্রায় ২০ ডলার সাশ্রয় হবে। ফলে বছরে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত নয়া দিগন্তকে বলেন, কনসালটেন্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং আইডিবি ঋণপ্রাপ্তি বহুল আকাক্সিক্ষত এই প্রকল্পের অগ্রগতির পথে উল্লেখযোগ্য মাইল ফলক। তিনি বলেন, আগামী ৩ সেপ্টেম্বর এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হবে। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে অবশেষে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতেও এটা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে করে প্রকল্প কাজ দ্রুত এগুবে বলে আমরা ্আশাবাদী। তিনি বলেন, কনসালটেন্ট নিয়োগের পরবর্তী ধাপ হবে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) কনস্ট্রাক্টর নিয়োগ। তাও সুন্দরভাবে দ্রুত হবে বলে আশারাখি। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ডিপিপিতে ৫ বছর ধরা হয়েছে বলেও তিনি জানান।