নয়া দিগন্ত ডেস্ক
বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বর্তমানে মিয়ানমারেই অ্যান্টিপার্সোনেল ল্যান্ডমাইনের কারণে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত ও আহত হচ্ছে। দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ, সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্ঘাত এবং ব্যাপকভাবে মাইন পুঁতে রাখার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর প্রভাব শুধু মিয়ানমারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও এর মরণফাঁদ ছড়িয়ে পড়েছে।
ল্যান্ডমাইন মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মিয়ানমারে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দুই হাজার ২৯ জন হতাহত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অ্যান্টিপার্সোনেল মাইন ব্যবহার করে আসছে। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নতুন একটি প্রবণতা দেখা গেছে- রাষ্ট্রবিহীন প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও সশস্ত্র সংগঠনগুলোও একই ধরনের মাইন ব্যবহার শুরু করেছে। ফলে সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে অন্তত ছয়জন নিহত এবং ২৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তবে দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে অনেক ঘটনা নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, তুমব্রু ও ফুলতলী পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২৮ কিলোমিটার সীমান্ত করিডোর এখন স্থানীয়দের কাছে ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে পরিচিত। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সঙ্ঘাতের কারণে এসব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে স্থলমাইনের ব্যাপক ঝুঁকি। গত দেড় বছরে এই করিডোরে অন্তত ৩৫ জন বাংলাদেশী ল্যান্ডমাইনের শিকার হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, রোহিঙ্গা, কৃষিশ্রমিক, জেলে এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির সদস্যরাও রয়েছেন।
ল্যান্ডমাইন ও অবিস্ফোরিত যুদ্ধাস্ত্রের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এ ধরনের ঘটনায় নিহত এক হাজার ৫২ জন বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে ২০ শতাংশেরও বেশি ছিল শিশু। ২০২২ সালে যেখানে এ ধরনের ৩৯০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’ চলতি বছরের জানুয়ারি ও মার্চের মধ্যে চিন ও রাখাইন রাজ্যে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাওয়া ১৬ জনের সাক্ষাৎকার নেয়। তাদের প্রত্যেকের জীবনই এক মুহূর্তে বদলে গেছে।
রাখাইনের বুথিডং টাউনশিপের কুং টাউং গ্রামের বাসিন্দা সোফায়াতুল্লাহ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা একটি মাইনে আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাম গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে হাঁটুর নিচের অংশও কেটে ফেলতে হয়।
চিন রাজ্যের পালেটওয়া জেলার কমিউনিটি নেতা উইন খিন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাইনে পা দেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে নেয়া হয়। একাধিক অস্ত্রোপচারের পর প্রাণে বাঁচলেও তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং এখন হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন।
রাখাইনের বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাসকারী মং অং হ্লাইং ২০২৪ সালের আগস্টে পাহাড় থেকে সবজি সংগ্রহ করে ফেরার পথে মাইনের শিকার হন। বিস্ফোরণে তার বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই ধরনের ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে নির্মাণশ্রমিক মোহাম্মদ তেকারকেও। বাঁশ সংগ্রহ করে ফেরার পথে মাইন বিস্ফোরণে তার বাম গোড়ালি উড়ে যায়। পরে বিপুল অর্থ ব্যয় করে একটি কৃত্রিম পা সংগ্রহ করতে সক্ষম হন তিনি।
ল্যান্ডমাইন শুধু শারীরিক অঙ্গহানিই ঘটায় না; এটি মানুষের জীবিকা, স্বাভাবিক চলাফেরা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
রাখাইনের কিশোর বন্ধু মাউং তুন নাইং ও মাউং তুন সেইন ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাঁশের কচি ডগা সংগ্রহ করতে গিয়ে বিস্ফোরণের শিকার হয়। ঘটনাস্থলেই তুন সেইনের ডান গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারা বলেন, ‘আমাদের জীবন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।’
নবী হাসান নামে আরেক ভুক্তভোগী ২০১৯ সালে ল্যান্ডমাইনে আহত হয়ে একটি চোখ ও একটি পা হারান। এখনো তার হাঁটতে কষ্ট হয় এবং রাতে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে।
মংডোর বাসিন্দা মোহাম্মদ রিজুয়ান ২০২৪ সালে বন্ধুদের সাথে কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে একটি পা হারান। তার ভাষায়, ‘শরীরের ব্যথা এখনো যায়নি, আর আগের মতো কাজও করতে পারি না।’
একসময় সাত একর জমির মালিক সচ্ছল কৃষক মাউং কিয়াও থান গ্রাম ছাড়ার সময় মাইনে আহত হয়ে প্রায় একটি পা হারান। এখন প্রতিদিনের জীবনই তার কাছে নতুন সংগ্রাম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের চলমান সঙ্ঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ল্যান্ডমাইন সঙ্কটও তত ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। কারণ সঙ্ঘাতরত পক্ষগুলো প্রায়ই নিজেদের অবস্থান রক্ষায় মাইন ব্যবহার করছে, কিন্তু পরে সেগুলোর অবস্থান চিহ্নিত বা অপসারণ করা হচ্ছে না। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর এই মরণফাঁদের শিকার হতে থাকবে।



