সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?

দুই দশকে প্রাণহানি ১,২৯,৫১১ : আহত ২,০৫,৯৪৮

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ
Printed Edition
সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?
সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। সড়ক ও মহাসড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। গত দুই দশকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এক লাখ ২৯ হাজার ৫১১ জন এবং আহত হয়েছেন আরো দুই লাখ পাঁচ হাজার ৯৪৮ জন।

নিহতদের তালিকায় বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনও রয়েছেন- চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীর, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, গীতিকার-সুরকার পাগল হাসান, সাফ গেমসে স্বর্ণজয়ী নৌবাহিনীর অ্যাথলেট মাহবুব আলম ও জাতীয় ক্রিকেটার মানজারুল ইসলাম রানার মতো ব্যক্তিত্ব। তবুও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ধারাবাহিক ব্যর্থতার অভিযোগ রয়েছে।

দুর্ঘটনার প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী

বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৫ সালে তিন হাজার ৯৫৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হন তিন হাজার ১৮৭ জন। ২০১০ সালে তা কিছুটা কমলেও পরবর্তী সময়ে আবার বাড়তে থাকে। ২০১৪ সালে পাঁচ হাজার ৯৯৭টি দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় আট হাজার ৭৯৮ জনে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক হয়েছে।

২০২২ সালে নিহত ৯ হাজার ৯৫১ জন (রেকর্ড)। ২০২৪ সালে নিহত আট হাজার ৫৪৩ জন। ২০২৫ সালে নিহত ৯ হাজার ১১১ জন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬.৯৪% বেশি। ২০২৫ সালে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৩৭ শতাংশের বেশি ছিল মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট। পথচারী মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনকভাবে বেশি। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই এক হাজারের বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে- জানুয়ারিতে ৪৮৭ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪৪৭ জন নিহত হন।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দলীয় সরকারের সময় দুর্ঘটনার হার বাড়ে। তাদের মতে, পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় আইন প্রয়োগে শিথিলতা দেখা যায়। ফলে বেপরোয়া চালনা, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নযোগ্য নয়- এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মালিক-শ্রমিকদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা কার্যকর নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

‘ভুল ডিজাইন’ বড় কারণ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দিন বলেন, ‘দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালককে দায়ী করা হয়; কিন্তু সড়কের ভুল ডিজাইনের জন্য ডিজাইনারদের জবাবদিহির আওতায় আনার নজির নেই।’

তিনি আরো বলেন, দক্ষ জনবলের অভাবে নকশাগত ত্রুটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন হয় না। আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গণপরিবহন খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। অন্তত ৬০ শতাংশ গণপরিবহন সরকারি ব্যবস্থাপনায় আনার প্রস্তাব দিয়েছেন অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দিন।

এ ছাড়া পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ড বা ফান্ড গঠন; চালকদের কর্মঘণ্টা সীমিত করা (চার ঘণ্টার বেশি নয়); চাঁদাবাজি বন্ধে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা- এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দুর্ঘটনা কমার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও কমবে বলে মনে করেন তিনি।

সরকারের অবস্থান

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: আনিসুর রহমান জানান, সরকারের ইশতেহার অনুযায়ী সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার।

পরিসংখ্যান বলছে, বছর ঘুরে বছর এলে বাড়ছে প্রাণহানি। নানা উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে সড়ক নিরাপত্তায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসছে না। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল থামবে কবে?